Textile Lab | Textile Blog: Fabrics
Fabric: Made in Bangladesh
বাংলাদেশে বর্তমানে ৪২৪ টি স্পিনিং মিল, ৭৯৪ টি টেক্সটাইল উইভিং মিল, ২৪১ টি ডাইং এবং ফিনিশিং মিল এবং মোট ৬,৫০০ টির বেশি নিবন্ধিত এবং ৫০০ টিরও বেশি অনিবন্ধিত গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল কারখানা রয়েছে। ১১ এপ্রিল, ২০১৭। সূত্রঃ গুগল। 

এই ৭০০০ টি গারমেন্টের প্রডাকশনের জন্য যে পরিমাণ ফেব্রিক যোগান দেয়া দরকার তা দেয়া সম্ভব হচ্ছেনা দেশীয় ফেব্রিক দিয়ে নিন্মক্ত কয়েকটি কারণেঃ 

১। বায়াররা চাইনিজ ফেব্রিক এপ্প্রুভ করে, কারণ চাইনিজরা বায়ারদেরকে তাদের ফেব্রিকের স্যাম্পল খুব দ্রুত বায়ারকে পাঠায় এবং বায়ার চায় তার প্রডাক্টে এই নতুন ডিসাইনের ফেব্রিক টা অবশ্যই থাকুক। যাতে সবার আগে সে বেচতে পারে। তাই ফেব্রিক এপ্রুভ হয়ে যায় তাড়াতাড়ি। 

২। আমাদের দেশীয় উদ্যোক্তারা ফেব্রিক মিল খোলার চাইতে গারমেন্ট কারখানা খোলাটাকে কম ঝামেলার মনে করে। 

৩। দেশীয় কাঁচামালের যোগান সেই পরিমাণ নেই তাই কাঁচামালের জন্য আবার চায়না বা অন্য দেশের দিকে হাত বাড়াতে হয়। 

৪। আমাদের ফেব্রিক গারমেন্টে ব্যাবহার না হওয়ায় ফেব্রিক মিল গুলি দিন দিন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অর্ডারের অভাবে। 

৫। আবার দেশীয় ফেব্রিকের মার্কেটিং দুর্বল হওয়ায় বায়ারদেরকে আকৃষ্টও করা যাচ্ছে না।  

এরকম আরও অনেক খুটি নাটি বিষয় আছে যার কারণে দেশে ফেব্রিক মিল বাড়ছে না বরং কমছে দিনকে দিন। 

তাতে সমস্যা কি ? 

সমস্যা অবশ্যই আছে। চায়নাতে এক সময় প্রচুর গারমেন্ট কারখানা ছিল। কিন্তু শ্রমিকের মজুরি বেশী হওয়ায় চায়না গারমেন্ট বন্ধ করে দিচ্ছে দিন কে দিন। তবে সে বন্ধ করেনি ফেব্রিক মিল এবং ট্রিমস ফেকটরি। এটা একটা বিজনেস পলিসি। 

ফেব্রিক বেচার জন্য সে বাংলাদেশের কোন ফ্যাক্টরির মালিকের সামনে এসে বসে থাকেনি। সে ধরেছে সরাসরি বায়ারকে। বায়ারকে সে কনভিন্স করেছে। এবার আপনি যাইবেন কই? ফেব্রিক আপনাকে তার কাছ থেকে কিনতেই হবে। উপায় নাই। কিন্তু ওখানেই সমস্যা। 

ফেব্রিকের জন্য আমরা যখন চায়নার উপর পুরাপুরি ঝুঁকে পরছি ঠিক এমন সময় যদি চায়না বলে যে আমি ফেব্রিক দিতে পারবো না তখন কি হবে? 

এই ৭০০০ পোশাক কারখানার কি হবে? কোথায় যাবে এতো শ্রমিক? 

যেভাবে গারমেন্ট শ্রমিকের মজুরি বেশী হওয়ায় চায়না গারমেন্ট বন্ধ করে দিয়েছিল তেমনি যদি একই কারণে চায়না ফেব্রিক মিলও বন্ধ কর দেয় তবে আমাদের জন্য এটা হবে বিশাল ক্ষতি আর এই ক্ষতি কোন কিছু দিয়ে  পূরণ করা যাবে না। কারণ, একবার যদি বায়ার হাত ছাড়া হয়ে যায় তবে তাকে আবার ফিরিয়ে আনা সহজ সাধ্য নয়। 

তা; কি করা যায়? 

১। দেশে আরো বেশী বেশী ফেব্রিক মিল খুলতে হবে। 

২। কাঁচামালের পর্যাপ্ত যোগান দিতে হবে। 

৩। দেশীয় কাপড় বায়ারদের চাহিদা অনুযায়ী বানিয়ে এপ্প্রুভ করাতে হবে। 

৪। দেশে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে হবে ফেব্রিক এন্ড ট্রিমসের কারখানা খুলতে হবে। 

৫। প্রয়োজনে চায়নিজ উদ্যোক্তা দেশে এনে ফেব্রিক কারখানা খুলাতে হবে, তাকে বুঝতে হবে যে তোমার দেশের চাইতে আমার দেশে শ্রমিকের মজুরি কম। 

৬। সরকারিভাবে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে হবে ফেব্রিক মিল খুলার জন্য। 

৭। ট্যাক্স বা অন্যান্য খরচ কমিয়ে দিয়ে হলেও ফেব্রিক মিল খুলতে উৎসাহিত করতে হবে।

৮। কাপড়ের কাঁচামালের যোগান যেই দেশে বেশী প্রয়োজনে তাদেরকে উৎসাহিত করতে হবে যে তোমরা ফেব্রিক মিল খুলো আমরা ফেব্রিক কিনবো তোমার কাছ থেকে। 

৯। দেশীয় ফেব্রিকের মার্কেটিং বাড়াতে হবে 

১০। যেকোনো ভাবে চায়নার একটা বিকল্প তৈরি করে রাখতে হবে আমাদের পোশাক শিল্পকে বাঁচাতে হলে। 

একচেটিয়া বা মোনোপলি বিজনেস করে যাচ্ছে চায়না আমাদের দেশে সেটা হয়তো সমস্যা না কারণ আমরা তো ফেব্রিক পাচ্ছি । কিন্তু সমস্যা হবে তখন যখন কোন একটা বিশেষ কারণে চায়না ফেব্রিক বানানো বন্ধ করে দিবে বা আমাদেরকে দরকারের তুলনায় কম ফেব্রিক দিবে। তাই এটা নিয়ে ভাবার এখনই সময় যদিও অনেক দেরী হয়ে গেছে।

Syed Rijoan Islam (Munna)🇧🇩
Social & Technical Auditor, Team leader: Inspection, Training. BVCPS BD, Myanmar, Sri Lanka, Fields: Garments, Soft & Hard Goods, Home Textile, Footwear, Accessories. Certified: BRC, Lean-Six Sigma Black Belt

বাংলাদেশী ফেব্রিক সাপ্লায়ার | Fabric: Made in Bangladesh

ডেনিমঃ 
অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। এক ভদ্রমহিলা এলেন জেকব ডব্লিউ ডেভিস নামক নেভাডাবাসী এক দর্জির কাছে। ভদ্রমহিলার স্বামী কাঠুরে। জঙ্গলের কাঁটাগাছে প্রায়ই জামা ছিঁড়ে যায়। তাই টেকসই পোশাক চাই। ডেভিসের মাথায় খেলে গেল বুদ্ধি। তখন এক ধরনের কাপড় পাওয়া যেত ফ্রান্সে। যার নাম সার্জ দে নিমে। তাই দিয়ে তৈরি হল প্যান্টস। দুশো জোড়া প্যান্ট বিক্রি হয়ে গেল চোখের নিমেষে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী জোগান দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত কাপড় নেই যে ডেভিসের কাছে! ডেভিস যোগাযোগ করল কাঁচামালের হোলসেলার লেভি স্ত্রাউসের সঙ্গে। ১৮৭৩ সালে এর ইউ এস পেটেন্ট বার করা হয়। আর সে দিনটিকেই ধরা হয় ‘ব্লু জিনস’-এর জন্মদিন।

কিন্তু শ্রমিক, কৃষক, মজুর শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এই পোশাক। তখন জিনসের সামনে দুটো ও পিছনে একটি পকেট লাগানো থাকত কপার রিভেট দিয়ে। পরে ঘড়ি রাখার জন্য সামনে ছোট পকেটের চল শুরু হয়। কারণ সময় ধরে শ্রমিক-মজুরদের কাজ করতে হত। তবে সময় সেখানেই থেমে থাকেনি। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে আমেরিকান সেনার পোশাক তৈরিতে ব্যবহার শুরু হয় ডেনিমের। যুদ্ধের পরেও কিছু সেনা তা বাইরে পরতে শুরু করে। পরিচিতি বাড়ে ডেনিমের।

ডেনিম কাচার নিয়মঃ

• গরম জলে কখনও ধোবেন না ডেনিম। তার জন্য চাই ঠান্ডা জল

• বেশি ক্ষার দেওয়া সাবানে ডেনিম না কাচাই ভাল। এতে রং ফিকে হয়ে যায়। তাই সাবানও হতে হবে হালকা

• আছড়ে কাচবেন না। বরং কিছুক্ষণ সাবান জলে চুবিয়ে রেখে হালকা হাতে ঘষে নিন

• কাচার পরে তা নিংড়োবেন না। বরং কোনও দড়িতে মেলে ডেনিমের জল ঝরে যেতে দিন। তার পরে তা রোদে দিন।

• প্যান্টস কাচার আগে তা উল্টে নিতে হবে। শুকোতেও হবে উল্টো করে

তত দিনে ভারতও স্বাধীন হয়েছে। চিন্তাভাবনার স্বাধীনতার প্রকাশ ঘটছে সাজপোশাকে। জাতপাত, শ্রেণিগত বিভেদ মিটিয়ে দিতে এগিয়ে এলেন শিল্পীরা। ১৯৫৫ সালে মুক্তি পেল ‘রেবেল উইদাউট আ কজ়’। সেই ছবিতে বিপ্লবী যৌবনের প্রতীক হিসেবে জনপ্রিয়তা পেল জিনস। ক্রমে ভারতেও বিভিন্ন কোম্পানি তৈরি করতে লাগল ডেনিম প্যান্টস।

ডেনিমের কাটঃ

দিনে দিনে কাটছাঁট বদলে নতুন নতুন স্টাইল তৈরি করল ডেনিম। জিনসের সেলাইও খুব গুরুত্বপূর্ণ। জিনসের বাইরের অংশ দিয়ে চলে যাওয়া হেম ফ্যাশন-জগতে নতুন সংজ্ঞা তৈরি করল। চোখ রাখা যাক বিভিন্ন ধরনের ডেনিমে...

স্ট্রেট কাট: 
সাধারণ প্যান্টসের আদলে এই ধরনের কাট তৈরি হয়। সামনে-পিছনে পকেটও থাকে।

স্কিনি: 
লুজ় প্যাটার্ন ভেঙে স্কিনটাইট ফিটিংসের প্যান্ট তৈরি হল। যা স্কিনি জিনস নামেই বেশি পরিচিত। র‌্যাম্প মডেলদের মধ্যে এই ধরনের জিনস বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়।

স্লিম ফিট: 
এ দিকে আমজনতা পড়লেন মুশকিলে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্কিনি জিনস পরা তো চাই, কিন্তু তা আরামের দফারফা করতে সময় নিল না। ফলে স্ট্রেটকাট ও স্কিনি জিনসের মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী স্লিম ফিট জিনস টেনে নিল সাধারণ মানুষ।

বুটকাট: 
একই ধরনের কাটে জিনসকে বেঁধে না রেখে হাঁটুর নীচ থেকে তা ছড়িয়ে দেওয়া হল। আগেকার দিনে বুট জুতো পরা হত বেশি। তা কভার করতেই এই ধরনের বুটকাট জিনস পরার চল শুরু হয়। যা আবার ফিরে এসেছে।

পালাজ়ো স্টাইল: 
আপাতত ফ্যাশন জগতে সবচেয়ে হিট এই কাট। ওয়াইড লেগ এই জিনস গরমেও পরা যায়। তাতে স্টাইলও বজায় থাকে, আবার আরামও।

পোশাকে ডেনিমঃ

শুধু প্যান্টসেই থেমে থাকল না ডেনিমের রাজত্ব। ক্রমশ তা ঊর্ধ্বাঙ্গের পোশাকেও তার রাজত্ব বিস্তার করল।

জ্যাকেট: 
নীল, কালচে, আকাশি... বিভিন্ন রঙের ডেনিম জ্যাকেট অনেক বছর ধরেই ফ্যাশনে ইন। আমাদের মতো দেশ ক্রান্তীয় অঞ্চলে হওয়ায়, এ দেশের হালকা শীতেও কাজে দেয় এই জ্যাকেট।

শার্টস: 
ডেনিম প্যান্টের সঙ্গে মানানসই ডেনিমের শার্টও পরতে পারেন। সাদা শার্টের কলারে বা হাতায় ডেনিমের প্যাচওয়র্কও নজর কাড়ে।

কুর্তি: 
ডেনিম কুর্তি বা টপ এখন সব রিটেল স্টোরেই পাওয়া যায়। এরও আবার অনেক ভাগ আছে। ছোট পাথরকুচি বা মুক্তো কুচি বসানো এমবেলিশ্‌ড ডেনিম, সুতোর টানে নকশা তোলা এমব্রয়ডার্‌ড ডেনিম বা অ্যাসিড ওয়াশ করা ডেনিমের টপ এখন র‌্যাম্পের প্রথম সারিতে। এ ছাড়াও অ্যাসিমেট্রিক কাটে ডেনিম কুর্তি বা টপও রাখতে পারেন নিজের ওয়ার্ডরোবে।

পুরনো ডেনিম নতুন করে পরুনঃ

• সাদা কুর্তির ভোল বদলাতে তার উপরে বসিয়ে নিতে পারেন ডেনিমের পকেট। পুরনো জিনসের প্যান্টস পকেটের আকারে কেটে বসিয়ে নিতে পারেন। মিনিটে লুক বদলে যাবে রোজকারের কুর্তির।

• ডেনিম কাপড় কেটে কুশন কভারও বানিয়ে নিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে জিনসের পকেটের অংশ বেছে নিলে আলাদা করে ডিজ়াইন করারও প্রয়োজন পড়বে না।

• গ্লাভ্‌স বানাতেও এর জুড়ি নেই। তা খুব একটা অসুবিধেজনকও নয়। পুরনো ডেনিমের প্যান্টসের উপরে নিজের হাত বসিয়ে আঙুল বরাবর পেন দিয়ে আউটলাইন টেনে নিন। তার পরে কাঁচি দিয়ে একই সঙ্গে নীচের কাপড়ও কেটে নিন। সুচ, সুতো দিয়ে ধার বরাবর সেলাই করে নিলেই উল্টে নিয়ে গলিয়ে নিতে পারবেন দু’হাতে।

• জিনসের কোমরের অংশ বা পায়ের বর্ডার কেটে চুলের ব্যান্ড বানিয়ে নিতে পারেন। এর জন্য লাগবে শুধু আর একটি ইলাস্টিক। জিনসের সেলাইয়ের মাঝখান দিয়ে ইলাস্টিক ঢুকিয়ে সেলাই করে নিন।

• প্যান্টসের কাপড় কেটে রকমারি ব্যাগও বানানো যায়। নিজে না পারলে কাছাকাছি দর্জিকে দিয়েও তা বানিয়ে নিতে পারেন।

বছর ঘুরে যত ধরনের কাট আর পোশাক আসুক না কেন, ফ্যাশন-জগতে ডেনিমের জায়গা কিন্তু সুরক্ষিত। গরমের সময়েও ফ্যাশন বজায় রাখতে পুরোদস্তুর সঙ্গ দিতে পারে এই কাপড়।

আপনিও কি ডেনিম প্রেমী? বেশ কিছু স্টাইলিং টিপস রইল আপনার জন্য

ফ্যাশানিস্তা হলে তিনি ডেনিমের ভক্ত হবেন না, এই কথা মানা যায় না। ডেনিমের সাহায্যে খুব সহজেই আপনার ড্রেস আপ হয়ে যায়। আপনাকে দেখতে সুন্দর লাগে ও অবশ্যই স্মার্ট লাগে! বছরের পর বছর ধরে বিশ্ব ফ্যাশনের পাশাপাশি ভারতীয় ফ্যাশনেও ইন ডেনিম। এক এক সময় এক এক রকম ডেনিম প্যান্ট ট্রেন্ডিং হয়েছে। আবার এক সময় ফিরে এসেছে পুরনো স্টাইলও (denim outfit ideas) । 

যেমন এখন কিন্তু আবার ধীরে ধীরে অ্যান্টি স্কিনি জিন্সের দিকেই আমরা ঝুঁকছি। তাছাড়া শুধুই ডেনিম প্যান্ট নয়, আপনার যদি একটি ডেনিম জ্যাকেট থাকে, তাহলে যে কোনও রকম ফ্যাশন স্টেটমেন্ট আপনি মুহূর্তে তৈরি করতে পারেন। কিংবা আপনি ডাংরি বা স্কার্ট পরতে পারেন, তাহলে তো কথাই নেই! হাল ফ্যাশনে ডেনিম ড্রেসও বেশ জনপ্রিয়। তাহলে বুঝতেই পারছেন, ডেনিমের ব্যাপারটাই আলাদা। কোনটা ছেড়ে কোনদিকে তাকাবেন আপনি! তাও আপনার জন্য কয়েকটি পরামর্শ রইল (denim outfit ideas)।

ডেনিম অন ডেনিমঃ

আপনি মনে করে দেখুন, নব্বইয়ে কিন্তু এই ট্রেন্ড বেশ বেশ জনপ্রিয় ছিল। কালের সঙ্গে সঙ্গে সেই স্টাইল ব্যাকডেটেড হয় ঠিকই। এখন কিন্তু আবার সেই ডেনিম অন ডেনিম ফ্যাশনে ইন। তার জন্য আপনি যে কোনও অ্যান্টি স্কিনি ডেনিম প্যান্ট পরতে পারেন। তার সঙ্গে উপরে ডেনিম শার্ট পরুন। ইন করে পরুন। বেশি ভাল লাগবে। পায়ে কনভার্স পরতে পারেন। তবে ডেনিম অন ডেনিমের সময় অবশ্যই ডেনিম অ্য়াকসেসরিজ এড়িয়ে যাবেন। যেমন – ডেনিম জুতো বা ব্যাগ এই ধরনের কিছু ব্যবহার করবেন না। তার বদলে সাদা রঙের অ্যাকসেসরিজ (denim outfit ideas) ব্যবহার করতে পারেন।

বয়ফ্রেন্ড জিনসঃ

এখনও যদি আপনি স্কিনি জিন্স পরেই সময় কাটিয়ে দেন, তবে আপনাকে বলব আশপাশে একটু তাকিয়ে দেখেন। স্কিনি জিন্স কিন্তু চলছে ঠিকই, তবে আপডেটেড থাকতে গেলে অ্যান্টি স্কিনি জিন্স তো পরতেই হবে। বয়ফ্রেন্ড জিন্স ট্রাই করুন। নব্বইয়ের সেই সময় একবার ফিরে গিয়েই দেখুন।

হাই ওয়েস্টঃ

লো ওয়েস্ট ডেনিম প্যান্ট? আরে সেসব এখন অতীত। এখন মিড ওয়েস্ট ও হাই ওয়েস্ট ডেনিম প্যান্ট পরছে সকলে চুটিয়ে। আপনি স্কিনি জিন্স পরলেও অবশ্যই হাই ওয়েস্ট বা মিড ওয়েস্ট ট্রাই (denim outfit ideas)করতে পারেন। বেশ ভাল লাগবে।

বেল বটমসঃ

বেল বটমস এই দুই শব্দই ফ্যাশন স্টেটমেন্ট বোঝানোর জন্য যথেষ্ট। বেল বটমস কিন্তু রমরমিয়ে চলছে। আপনিও ট্রাই করে দেখুন না। তবে এই ক্ষেত্রে টাইট টপ পরার চেষ্টা করবেন।

ডেনিম জ্যাকেটঃ

এই জ্যাকেট কোন পোশাকের সঙ্গে মানায় না বলুন তো? সব ধরনের পোশাকের সঙ্গে আপনি ডেনিম জ্যাকেট পরতে পারেন। আপনি ডেনিম প্যান্টের সঙ্গে উপরে জ্যাকেট পরতে পারেন। পাশাপাশি কোনও ড্রেসের উপরে ডেনিম জ্যাকেট পরুন। আপনার লুকই বদলে যাবে। শাড়ির সঙ্গেও কিন্তু কোটের মতো ডেনিম জ্যাকেট আপনি পরতে (denim outfit ideas) পারেন।

প্যাচওয়ার্ক জিন্সঃ

নব্বইয়ের দশকের ট্রেন্ড । প্যাচওয়ার্ক করা জিন্স। এই ধরনের জিন্সের উপর একটা ট্য়াঙ্ক টপ পরে নিন। তার উপর চাপিয়ে নিন একটা ডেনিম শার্ট। তবে খুব বেশি কাজ করা নেবেন না। অল্প কাজ করা ডেনিম প্যান্ট (denim outfit ideas) নিন।

ডেনিম স্কার্টঃ

শর্টস হোক বা মিডি লেন্থ, যে কোনও ডেনিম স্কার্ট সব সময় হট! আপনি কোথাও ঘুরতে যাচ্ছেন? চোখ বন্ধ করে বেছে নিন ডেনিম স্কার্ট। দেখতে কিন্তু দরুণ লাগবে। আবার ডেনিম ক্রপ টপের সঙ্গে আপনি ডেনিম ম্যাক্সি স্কার্টও পরতে পারেন। গরমে ভাল লাগবে।

ডাংরিঃ

এই পোশাক অনেকেরই প্রিয়। ক্যাজুয়াল ওয়েস্টার্ন হিসেবে ডাংরির ভাল কদর রয়েছে। আপনিও ট্রাই করে দেখুন। তবে পায়ে কনভার্স পরলে বেশ ভাল লাগবে।


ডেনিম নিয়ে কিছু তথ্য | Denim Jeans

ডেনিম-জিনসের শত বছরের ইতিহাস | Denim Jeans 
সমুদ্র পাড়ি দেওয়া নাবিক-বণিকদের পরনের আঁটসাঁট টুইল ট্রাউজার থেকে আজকের দিনে যেকোনো রুচিসম্মত ওয়ার্ডরোব প্রধান পোশাক ডেনিম হেঁটেছে এক লম্বা পথ।

ডেনিমের মতো আর কোনো কাপড়ই এখন অবধি ফ্যাশনজগতে এতটা বিপ্লব সৃষ্টি করতে পারেনি। 

'ফ্যাশনের নিয়ম হলো, এটি রহস্যময়। ব্লু জিনস কেন ক্লাসিক? কারণ, আপনি হুট করেই এমন কিছু একটা পেয়ে যান, যেটি আপনার জন্য সঠিক এবং যাকে সময়ের সীমায় বন্দী করা যাবে না।'

এভাবেই জিনস সম্পর্কে নিজের অভিমত জানিয়েছিলেন বেলজিয়ামের বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার ডায়ান ফন ফার্স্টেনবার্গ।

অথচ ডেনিম জিনস আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের এতটাই অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে যে আমরা খুব কমসংখ্যক ব্যবহারকারীই এ প্রশ্ন তুলি: কীভাবে তৈরি হয় এ জিনস, আর কী-ই বা এর ইতিহাস?

বাজারে আজকাল হরেক রকমের ডেনিম জিনসের সমাহার। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনো এটি সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ও টেকসই কাপড়। এর আবেদনও চিরন্তন, সব সময় অমলিন।

ডেনিমের মতো আর কোনো কাপড়ই এখন অবধি ফ্যাশনজগতে এতটা বিপ্লব সৃষ্টি করতে পারেনি। সমুদ্র পাড়ি দেওয়া নাবিক-বণিকদের পরনের আঁটসাঁট টুইল ট্রাউজার থেকে আজকের দিনে যেকোনো রুচিসম্মত ওয়ার্ডরোব প্রধান পোশাক ডেনিম হেঁটেছে এক লম্বা পথ।

চলুন একে একে জেনে নিই ডেনিমের জন্ম-ইতিহাস ও পথচলার আখ্যান।

ডেনিমের জন্মঃ

ইংরেজি জিনস (jeans) শব্দটির আবির্ভাব ১৫৬৭ সালের  'জেনোয়িজ' (genoese) বা 'জিনস' (genes) থেকে। এই শব্দগুলো ব্যবহৃত হতো ইতালিয়ান সমুদ্রতীরবর্তী শহর জেনোয়া থেকে আগত বণিকদের পরনের শক্ত টুইল ট্রাউজারকে বর্ণনা করতে।

কোন কাপড় থেকে তৈরি হতো এই টুইল ট্রাউজার? ইউনিভার্সিটি অব এক্সিটারের ইনস্টিটিউট অব আরব অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজের অনারারি সিনিয়র রিসার্চ ফেলো এবং 'ইন্ডিগো ইন দ্য আরব ওয়ার্ল্ড' (রওটলেজ, ১৯৯৬)-সহ ইন্ডিগোর ওপর বেশ কিছু বইয়ের রচয়িতা জেনি বেলফোর-পল আমাদের ধারণা দেন এ ব্যাপারে। তার মতে, 'ইসলামিক যুগের শুরুর দিকে বেশ শক্ত ও বলিষ্ঠ একটি মিসরীয় কাপড় ইতালিতে আমদানি করা হয়। কাপড়টির নাম ছিল ফুসতিয়ান (কথাটি এসেছে ফুসতাত থেকে, যেটি ছিল কায়রোর পূর্ববর্তী নগরী)। এই কাপড়ের অনুকরণে জেনোয়ার তাঁতিরা তাদের নিজস্ব একটি সংস্করণ তৈরি করতে থাকে। সেটির নাম তারা দেয় জিন ফুসতিয়ান, যাতে ইন্ডিগো নীল রং ব্যবহার করত তারা। জিন ফুসতিয়ানের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সাথে সাথে এটির জিন নামটুকুই লোকমুখে অধিক প্রচলিত হয়ে যায়। সে জন্যই এ কাপড়কে বলা হতো জিনস বা জেনোয়িজ।'

পরবর্তীতে ফ্রান্সের নিমসের তাঁতিরাও এ কাপড়ের পুনরুৎপাদন শুরু করে। তারা সেই কাপড়কে বলত 'টুইল উইভ ফ্যাব্রিক' নামে, যেখানে ব্যবহৃত হতো একটি রঙিন সুতো (প্রধানত ইন্ডিগো ডাই করা) এবং একটি সাদা সুতো। সেই কাপড়টির ছিল এক ভিন্নধর্মী স্বাতন্ত্র্য এবং শ্রমিক শ্রেণির মানুষের পরনের জন্যও কাপড়টি খুব ভালোভাবে মানিয়ে যায়।

আজকে আমরা সেই কাপড়কেই বলি ডেনিম নামে। এই ডেনিম শব্দটি এসেছে "সার্জ দে নিমস' থেকে, অর্থাৎ 'সার্জ ফ্রম নিমস' বা নিমসের কাপড় থেকে।

ডেনিমের ব্র্যান্ডিংঃ

ডেনিম জিনসের ব্র্যান্ডিংয়ের নেপথ্যে রয়েছেন লেভি স্ট্রসের হাত। ১৮৫৩ সালে তিনি সান ফ্রান্সিসকোতে চলে আসেন 'গোল্ড রাশ'-এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিত্বদের জন্য একটি ড্রাই গুড স্টোর খুলতে। তার দোকানে তখন পাওয়া যেত আমদানি করা সুতি কাপড় ও ডেনিম। ওই সময় জ্যাকব ডব্লিউ ডেভিস নামের আরেক দর্জি তৈরি করতেন তাঁবু, ঘোড়ার কম্বল, ওয়্যাগন কভার ইত্যাদি। একপর্যায়ে তিনি স্ট্রসকে প্রস্তাব দেন তার সঙ্গে পার্টনারশিপের মাধ্যমে ধাতুযুক্ত কাপড়ের পেটেন্ট করে সেগুলো বিক্রির। এভাবেই নানা ধাতব পিন বা প্লেট যোগ করে স্ট্রসের ডেনিমকে আরও টেকসই ও মজবুত করে তোলা হয়।

এভাবেই স্ট্রস ও ডেভিস পার্টনার হয়ে যান এবং ১৮৭৩ সালের ২০ মে তারা ইউনাইটেড স্টেটস পেটেন্ট অ্যান্ড ট্রেডমার্ক অফিস থেকে পেটেন্ট লাভ করেন। কম বয়সীদের কাছে তাদের নতুন চেহারার জিনস অনেক জনপ্রিয়তা পায়। শুরুর দিকে স্ট্রস ও ডেভিস যুগল দুই ধরনের কাপড় বানাতেনÑব্রাউন ডার্ক ও ব্লু ডেনিম। কিন্তু এরপর ১৮৯০ সালে ডেনিম ৫০১ স্টাইলের আবির্ভাবের মাধ্যমে ডেনিমের আধুনিকীকরণের পথ সুগম হয়।

ক্রমে ডেনিম জিনসে অনেক ধরনের পরিবর্তন ও উন্নতিই আসতে থাকে। যেমন ১৯২২ সালে বেল্ট লুপ আসে, এবং বোতামের জায়গা দখল করে জিপার। কিন্তু ১৮৯০ সালের সেই পার্টনারশিপের সমাপ্তি ঘটে, যখন অশকশ বিগশ, র‌্যাংলার ও লি মার্সেন্টাইলরা লাইমলাইটে আসে।

ডেনিমের বিবর্তনঃ

১৫০ বছরে জিনসের মধ্যে প্রচুর পরিবর্তন এসেছে। ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকেও জিনস ছিল প্রধানত 'ওয়েইস্ট ওভারাল' এবং যুক্তরাষ্ট্রে এগুলো ওয়েস্টার্ন কাউবয়, খনিশ্রমিক ও কৃষকরাই কেবল পরতেন। দামে সস্তা ও শক্তপোক্ত হওয়ায় এটি শ্রমজীবী পুরুষদের দৈনন্দিন পোশাকে পরিণত হয়।

বিংশ শতকের শুরুর দিকে, বিশেষত প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সৈন্যদের মাঝে ডেনিম পরার প্রবণতা বেড়ে যায়। যোদ্ধারা লি ইউনিয়ন জিনস বেশি পরতেন। এভাবে সামরিক শক্তির সঙ্গেও ডেনিমের যোগসূত্র স্থাপিত হয়।

মধ্য-পঞ্চাশের দশকে এসে জিনস শব্দটির ব্যবহার বেড়ে যায়, এটিকে অন্যান্য কাপড়ের থেকে আলাদা করার জন্য। মারলন ব্র্যান্ডোর 'দ্য ওয়াইল্ড ওয়ান' ও জেমস ডিনের 'রেবেল উইদাউট আ কজ' ইত্যাদি ছবি দেখে তরুণেরা বিপ্লবের প্রতীক হিসেবে ডেনিম পরা শুরু করে।

১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে ম্যাগাজিনগুলোর প্রচ্ছদে বারবার আসার সুবাদে বেলবটম তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৬৫ সালে নিউইয়র্ক ইস্ট ভিলেজের একটি বুটিক এক অভূতপূর্ব ধারণার জন্ম দেয়। তারা চেয়েছিল এক জোড়া জিনসকে এমনভাবে ধুতে যেন সেটিকে ব্যবহৃত ও ছেড়া মনে হয়। পাশাপাশি তারা সেটিতে কাপড়ে তালিও লাগায়।

১৯৬০-এর দশকজুড়ে এবং ১৯৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে হিপি ও যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনকারীরাও জিনস পরতে শুরু করেন। এর মাধ্যমে তারা শ্রমজীবী শ্রেণির সঙ্গে সংহতি দেখাতেন। এদিকে নারীবাদী ও উইমেনস লিবের সংগঠকেরাও জেন্ডার ইকুইটি বা ন্যায়বিচারের প্রতীকী হিসেবে ব্লু জিনসকে বেছে নেন।

১৯৭৬ সালে ক্যালভিন ক্লেইন প্রথম রানওয়েতে জিনস দেখান। এরপর তাকে অনুসরণ করেন ডিজাইনার গ্লোরিয়া ভ্যান্ডারবিল্টও। এভাবে ১৯৮০-এর দশকে অ্যাসিড-ওয়াশ জিনসের পরিচিতি গড়ে ওঠে।

ঢিলেঢালা, ছেড়া জিনস বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয় ১৯৯০-এর দশকে। সেই সময়ে ভার্সেস, ডলসে অ্যান্ড গ্যাবানা এবং ডায়রের মতো ফ্যাশনহাউসও জিনসের বাজারে প্রবেশ করে। তাদের পথ ধরেই নতুন শতাব্দীতে স্কিনি বা গায়ের সঙ্গে সেঁটে থাকা জিনসের নিজস্ব ফ্যানবেজ গড়ে ওঠে।

শেষ কয়েক দশক ধরে ভিন্ন ভিন্ন আর্থসামাজিক শ্রেণি-পেশার মাঝেও জিনসের অভিন্ন ব্যবহারের চল শুরু হয়েছে। তাই আলাদা করে আর কোন শ্রেণি-পেশার জন্য কোন ধরনের ডেনিম জিনস, তা আর বলা যায় না। বরং পরিহিত জিনস এখন কেবলই যেকোনো শ্রেণি-পেশার ব্যক্তিবিশেষের নিজস্ব রুচি ও শৈলীর পরিচায়ক হয়ে উঠেছে।

ডেনিম ও হলিউডঃ

১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে ব্লু জিনসকে রোমান্টিসাইজ করতে সাহায্য করেছে হলিউড। সে সময় জন ওয়েইন ও গ্যারি কুপারের মতো সুদর্শন অভিনেতারা কাউবয় চরিত্রে অভিনয় করতেন ডেনিম ট্রাউজার পরে।

এই গ্ল্যামারাস নতুন রূপ নজর কাড়ে সেসব ক্রেতাদের, যারা উইকেন্ডসহ অন্যান্য ছুটির দিনে সাদাসিধে, আরামদায়ক অথচ আকর্ষণীয় কোনো পোশাকের সন্ধান করছিল।

এদিকে নারীরাও জিনসের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠে জিনজার রজার্স ও ক্যারোল লোম্বার্ডের মতো তারকাদের জিনস পরতে দেখে। ১৯৩০-এর দশকে বিখ্যাত ম্যাগাজিন 'ভোগ'ও জিনসের ব্যাপারে তাদের অনুমোদন দেয় একে 'ওয়েস্টার্ন চিক' নামে আখ্যায়িত করার মাধ্যমে। তাই তো ১৯৪২ সালে আমেরিকান ডিজাইনার ক্লেয়ার ম্যাককারডেল তার ডেনিম পপওভার র‌্যাপ ড্রেস বিক্রি করেন ৭৫ হাজারেরও বেশি পিস।

তবে যেমনটি আগেই বলেছি, ১৯৫০-এর দশকে এসেই কেবল জিনসের সঙ্গে তরুণ প্রজন্ম বিপ্লবী, প্রথাবিরোধী ভাবমূর্তির সন্ধান পায় মারলন ব্র্যান্ডো ও জেমস ডিনদের কল্যাণে। এই তারকাদের কারণে জিনসের বিপুল যৌনাবেদনও তৈরি হয়। রক 'এন' রোল তারকাদের কারণে জিনস পরা 'কুল' ব্যাপারও হয়ে ওঠে।

ডেনিমের বর্তমানঃ

ডেনিম এখন বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে জনপ্রিয় 'ক্যাজুয়াল ওয়্যারড্রোব'। ২০২০ সালে ডেনিম কাপড়ের বাজারমূল্য ছিল ২১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। আশা করা হচ্ছে, ২০২৬ সাল নাগাদ তা ২৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।

ডেনিম বা ব্লু জিনসের খুচরা বিক্রি ডেনিম ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে মূল্যবান চ্যানেল। ২০২৭ সাল নাগাদ খুচরা বিক্রির মূল্যমান ৭১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে। তা ছাড়া ধারণা করা হচ্ছে, ওই বছর বৈশ্বিক ডেনিম জিনসের বাজারের মূল্য দাঁড়াবে ৮৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।

চীন এখন বিশ্বে ডেনিম কাপড়ের শীর্ষ রপ্তানিকারক। তারা অন্তত ৮৫ শতাংশ তুলা দিয়ে তৈরি ডেনিম রপ্তানি করে। তাদের ডেনিমে তুলার শতাংশ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ, কেননা এই সুতাগুলোর ব্যাপ্তি বাড়বে, কিন্তু কখনো সংকুচিত হবে না।

এদিকে চীন ও হংকং সবচেয়ে বেশি ডেনিম কাপড় আমদানিও করে, বিশেষত যেসব ডেনিম তৈরি হয় ৮৫ শতাংশের কম তুলা দিয়ে। অন্যদিকে মিসর অন্তত ৮৫ শতাংশের কম তুলা দিয়ে তৈরিকৃত ডেনিমের শীর্ষ রপ্তানিকারক।

এই মুহূর্তে লেভি স্ট্রসের হাতে রয়েছে বৈশ্বিক জিনসের বাজারের সবচেয়ে বড় শেয়ার। ২০২০ সালে তাদের বিক্রি ছিল ৪ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সালে লেভি স্ট্রসের বিক্রির ৮৭ শতাংশই ছিল লেভিস ব্র্যান্ডের আওতায়। অন্যদিকে ২০২০ সালে ভিএফ করপোরেশনের জিনসের পোশাকের বিক্রি ছিল ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। নর্থ ফেস, টিম্বারল্যান্ড ও ভ্যানসের মতো ব্র্যান্ডগুলো রয়েছে তাদের মালিকানায়।

কপিরাইটঃ 
দ্যা বিজনেস স্টেন্ডার্ড 
ইজেল
জান্নাতুল নাঈম পিয়াল

ডেনিম-জিনসের শত বছরের ইতিহাস | Denim Jeans

খাদি শিল্প কি:
খাদি বা খদ্দর উপমহাদেশের হাজার বছরের ঐতিহ্য। মাটিতে গর্ত বা খাদ খুঁড়ে তাতে স্থাপনা করে এ কাপড় তৈরি করা হয়।

অনেকের মতে, খাদ থেকে তৈরি করা হয় বলে কাপড়ের নাম হয়েছে খাদি। একটি পেশাজীবী সম্প্রদায় তাঁত শিল্পের সাথে তখন জড়িত ছিলেন তাদের কে স্থানীয় ভাষায় বলা যুগী বা দেবনাথ।

ভারত উপমহাদেশে খাদির উৎপত্তি ঘটে প্রায় ৭ হাজার বছর আগে। তৎকালীন বাংলায়ও হাজার বছর আগে থেকেই খাদি শিল্পের প্রমাণ মেলে।

১২শ শতাব্দীতে মার্কো পোলোর লেখায় বাংলার খাদির জৌলুস ফুটে উঠেছে। তিনি লিখেছেন বাংলার খাদি মাকড়সার জালের চেয়েও মিহি। রোমানরাও বাংলার খাদি -মসলিনের ব্যাপক  ভক্ত ছিল। মধ্যযুগের প্রচুর মুসলিম বাংলা থেকে রোমান সাম্রাজ্য রপ্তানি হতো।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে উপমহাদেশে ইংরেজদের যান্ত্রিক কারখানায় তৈরি কাপড় দাপট বেড়ে যায়। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে বহু মানুষের জীবিকার উৎসটি। এ সময় মহাত্মা গান্ধী স্বদেশী আন্দোলনের ডাক দেন।খাদি ছিল স্বদেশী আন্দোলনের প্রধান হাতিয়ার। স্বদেশী আন্দোলনের ডাকে খাদি শিল্পীরা আবারো নতুন উদ্যমে শুরু করেন খাদি উৎপাদন।

বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লা অঞ্চলের খাদি মুঘল আমলেও ছিল জনপ্রিয়তার শীর্ষে । ১৯২১ সালে গান্ধীজী খাদি শিল্পীদের উৎসাহ দিতে কুমিল্লার চান্দিনায় ভ্রমণে আসেন।

এ সময় ভারত তন্তবায় সীমিত প্রতিষ্ঠিত হয়। সমিতিটি কুমিল্লার খাদি ভারতের বিভিন্ন শহরের রপ্তানি করতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে।খাদি শিল্প ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রাম নোয়াখালীসহ দেশের আরও কয়েকটি অঞ্চলে। বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা ডক্টর আখতার হামীদ খান এবং রাজনীতিবিদ ফিরোজ খান নুন ও খাদির জন্য ব্যাপক অবদান রেখেছে।

১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘দি খাদি অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশন’। কিন্তু স্বাধীনতার পর বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও,খাদি সেই পুরনো জৌলুস আর ফেরানো যায়নি ।

কুমিল্লার চান্দিনা,মুরাদনগর ও দেবিদ্বারে এখনো শতাধিক তাঁত টিকে আছে। খাদি শিল্প প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটিকে ধরে রাখার। কিন্তু, আধুনিক যুগের যান্ত্রিক কারখানার সাথে টিকে থাকা দিন দিন অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এছাড়া খাদি তৈরির কাঁচামালের দামও অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে, এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারের সরাসরি সহযোগিতা ছাড়া বিকল্প কোন উপায় নেই।

কার্পাস তুলা থেকে তৈরি হতো সুতা এবং সেই সুতা ব্যবহার করে চরকায় তৈরি হতো খাদি কাপড়। উপমহাদেশে খাদি কাপড়ের প্রচলন অনেক আগে থেকেই ছিল।তবে মহাত্মা গান্ধী যখন জনগণকে নিয়ে স্বদেশী আন্দোলন শুরু করেন তখনই এই খাদি কাপড়ের ব্যবহার বাড়তে থাকে।তাই ভারতীয় উপমহাদেশে এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মহাত্মা গান্ধীর কথা বলা হয়।

১৯২০ সালে তিনি প্রথম খাদি কাপড়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং সবার সামনে নিয়ে আসেন স্বদেশী পণ্য কে প্রতিষ্ঠা উদাহরন হিসাবে। মহাত্মা গান্ধীর চেতনাটি ছিল_স্বরাজ প্রতিষ্ঠানের জন্য স্বদেশী পণ্য কে প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবংখাদি কাপড় হতে পারে তার প্রধান উদাহরণ।

১৯২১ সালে কুমিল্লা চান্দিনা অঞ্চলে মহাত্মা গান্ধী আসেন এবং বিদেশী কাপড় ছেড়ে দেশে কাপড় ব্যবহারের সবাইকে আকৃষ্ট করেন। তিনি নিজে খাদি কাপড়ের চরকায় সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেন

১৯৩০ সালে ভারতের কুমিল্লার (বর্তমান চান্দিনা) কাটা চরকায় সুতা ও তকলীতে কাপড় তৈরির কাজ চলতো নিখিল ভারত কার্টুর্নি পরিচালনার মাধ্যমে।  ডায়িং মাষ্টার হিসেবে কাজ করতেন শৈলেন্দ্র নাথ গুহ ।তার গ্রামের বাড়ি ছিল চট্টগ্রাম জেলায়।ঐ সময় তিনি অনেক গুরুত্ব ভূমিকা রাখেন খাদি শিল্প জন্য।

খাদি কাপড়ের আদি ঠিকানা হলো কুমিল্লা জেলার চান্দিনা উপজেলায়।প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মাধাইয়া, কলাগাও, কুটুম্বপুর, গোবিন্দপুর, হাড়িখোলা, ভোমরকান্দি, বানিয়াচং, হারং, ছয়ঘরিয়া, বেলাশ্বর, মধ্যমতলা ও দেবিদ্বার,ভানী, ইত্যাদি গ্রাম খাদি কাপড়ের জন্য বিখ্যাত।

স্বদেশী আন্দোলন ও খাদির সম্পর্ক:

তখনকার ইংরেজ শাসন মালের সময় পুরো উপমহাদেশজুড়ে ইংরেজদের পণ্য বাজার অনেক দাপট ছিল। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে উপমহাদেশের ইংরেজদের যান্ত্রিক কারখানার কাপড় তৈরি পরিমাণ বেড়ে যায়। তখন হারিয়ে যাচ্ছিল বহু মানুষের জীবিকার আয়ের উৎসটি। ঐই সময়ে মহাত্মা গান্ধী স্বদেশী আন্দোলনের ডাক দেন।

খাদি ছিল স্বদেশী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার স্বদেশী আন্দোলনের ডাকে খাদি শিল্পীরা প্রাণ ফিরে পায় এবং নতুন উদ্যমে শুরু করে খাদি উৎপাদন। বিদেশি পণ্য কেনা বাদ দিয়ে দেশি পণ্য ব্যবহারে আকৃষ্ট হলো। তখন মানুষ নিজেদের পোশাকের গুরুত্ব বাড়লো। খাদি কাপড় ও তার ব্যবহার শুরু করল।

খাদি আন্দোলন কী ?

উপমহাদেশে খাদি কাপড়ের প্রচলন অনেক আগে থেকে থাকলেও এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মহাত্মা গান্ধীর কথাই বলা হয় প্রথমে! কারণ ১৯২০ সালে তিনিই প্রথম স্বদেশী পণ্যকে প্রতিষ্ঠার উদাহরণ হিসেবে খাদি কাপড়কে নিয়ে আসেন সবার সামনে এবং এর গুরুত্ব তুলে ধরেন। 'স্বরাজ' প্রতিষ্ঠার জন্য স্বদেশী পণ্যকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং খাদি কাপড় হতে পারে এর অন্যতম উদাহরণ- এ চেতনাকেই জাগ্রত করেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। এ কারণেই স্বদেশী আন্দোলনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত খাদি কাপড়। ১৯২১ সালে মহাত্মা কুমিল্লার চান্দিনা অঞ্চলে আসেন এবং বিদেশী কাপড় ছেড়ে দেশী কাপড় ব্যবহারে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি নিজে চরকার ব্যবহার সম্পর্কে প্রশিক্ষণও দেন!

১৭শ শতাব্দীর দিকে ত্রিপুরা রাজ্যে খাদি কাপড় বোনাকে পেশা হিসেবে নিয়েছিল প্রচুর লোক। বাংলাদেশের মধ্যে কুমিল্লা খাদি কাপড়ের জন্য বিখ্যাত জায়গা। ময়নামতি, চান্দিনা, গৌরিপুরসহ বেশ কিছু জায়গায় খাদি বুননের কাজ চলত। রঙিন খাদি কাপড়ের লুঙ্গি, শাড়ি, গামছা সেসময় ময়নামতিতে তৈরি হতো এবং দুই থেকে পাঁচ টাকার মধ্যে সেগুলো কিনতে পাওয়া যেত।

খাদি শিল্পের বর্তমান অবস্থা:

কুমিল্লা জেলার সাথে খাদিশিল্প আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। একসময় এই খাদির খুব প্রচলন ছিল। কুমিল্লায় আগে গান্ধী অভয়াশ্রমে এ খাদি তৈরি হতো। কুমিল্লা শহরের চান্দিনা উপজেলায় এখনও গান্ধীজীর স্মৃতিবিজড়িত তাঁত রয়েছে।

বর্তমানে কুমিল্লার খাদি পণ্যের বিক্রয় কেন্দ্র গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু বিক্রয় কেন্দ্র রয়েছে খাদি কটেজ, খাদি হাউস, গ্রামীণ খাদি, খাদি আড়ৎ ইত্যাদি খুবই জনপ্রিয়।

খাদি কাপড়ের কোয়ালিটি অনেক ভিন্নতা রয়েছে। যেমন পাতলা মোটা চেক এবং বিভিন্ন রঙের গজ কাপড় পাওয়া যায়।খাদি কাপড়ের প্রতি গজ ৮০ থেকে ১৫০ টাকা মূল্যে আনুমানিকভাবে ধারণা করা যায়।এছাড়াও রয়েছে খাদির সাল রুমাল বেডকভার ওরনা থ্রীপিজ এবং শাড়ি ও পাওয়া যায়

বর্তমানে আমাদের দেশে খাদির পূর্বের মতো বিশুদ্ধ বৈশিষ্ট্য নেই। সেখানে খাদ ঢুকেছে। বর্তমানে যে খাদি কাপড় তৈরি হয়ে থাকে সেই কাপড়ে রয়েছে মিল এবং হাতে কাটা সুতার সমন্বয়। এখানে টানাতে ব্যবহৃত হয় মিলের সুতা।

পরিতাপের বিষয়, এত বছর পরও এ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। কারণ কাপড়ে খাদি সুতার পরিমাণ আরও কমেছে; মিলের সুতার পরিমাণ বেড়েছে।

 উপরন্তু মিলেরই এক ধরনের সুতা তৈরি হচ্ছে। ওই সুতা দিয়ে তৈরি কাপড় একেবারে খাদি কাপড়ের টেক্সচারের মতো। একে বলা হচ্ছে ‘নিব’। ফলে বাজারে এটাকেই খাদি বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যা সাধারন ক্রেতার জন্য বুঝা কঠিন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমাদের দেশে খাদি নিয়ে কাজ হচ্ছে না।

খাদি শিল্পে পরিবর্তন ও আধুনিকতার ছোঁয়া:

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খাদির এসেছে অনেক পরিবর্তন। এ প্রসঙ্গে আসার আগে খাদি বা খদ্দরের মৌলিক কিছু বিষয়ের জানা প্রয়োজন রয়েছে।

খাদি কাপড়ের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য হলো হাতে কাটা সুতা দিয়ে হাতে বোনা কাপড়।এই বুনন কেবল সুতি সুতায় নয়। হতে পারে এবং হয়ও রেশম, অ্যান্ডি, মুগা, তসর, উল প্রভৃতিতে। অবশ্য হ্যান্ড স্পান সুতাই কেবল নয়, থাই স্পান সুতাও হতে পারে খদ্দরের উপকরণ। পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ খাদি খুব প্রচলন রয়েছে আছে । সেখানে দেখা মিলবে বিভিন্ন ধরনের খাদি যেমন উল,সিল্ক সুতির মতো। 
আবার আমাদের এ অঞ্চলের খাদি সুতি ও রেশমি। আমাদের এখানে খাদি সিল্ক বলতে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। এন্ডিকে বলা হয় খাদি সিল্ক। আসলে তা নয়।

অবশ্য আগে বিভিন্ন সুতা দিয়ে তৈরির কথা বলেছি; সেটাও এক ধরনের ব্লেন্ডিং। অবশ্য এই ব্লেন্ডিংটা অন্য রকম। এখানে এক বা একাধিক তন্তুকে মিশ্রিত করে একেবারে নতুন তুলায় পরিণত করে।সেই তুলা থেকে সুতা কাটা হচ্ছে। আর সেই মিশ্রিত সুতা দিয়ে তৈরি হচ্ছে খাদি মেটেরিয়াল।আর এই মিশ্রিত সুতাতে অনেক নানা ধরনের পরিবর্তন রয়েছে।

ক্রেতাদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে ও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এখন বেশ আধুনিক কিছু ডিজাইনে খাদি কাপড় বানানো হচ্ছে। খাদি শিল্পে নতুন কিছু আধুনিকতা ও পরিবর্তনের এসেছে। সাদামাটা রঙের খাদি কাপড় এখন বিভিন্ন রঙে ছাপা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজগুলোতে অনেক চাহিদা বেড়েছে খাদি কাপড়ের পোশাক। বিশ্বের উন্নত কিছু  দেশগুলোতে খাদি কাপড়ের তৈরি পোশাক রপ্তানি হচ্ছে।

খাদি শিল্পে সমস্যা ও তা উত্তরনের উপায়:

বর্তমানে খাদির কাপড়ের যথেষ্ট চাহিদা না থাকলেও দেশে এবং বিদেশে অল্প অল্প খাদি পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। ফ্রান্স, স্পেন, ডেনমার্ক, তুরস্কসহ বেশ কয়েকটি দেশে এই পণ্য রপ্তানি হয়। বর্তমানে এই শিল্প টিকে থাকলেও ভবিষ্যতে এর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

১)  তুলার অপর্যাপ্ততা। খাদি কাপড় বুনতে ন্যাচারাল ফাইবার প্রয়োজন হয় যা আমাদের দেশে বিদেশ হতে আমদানি করতে হয়। অর্থাৎ আমাদের দেশে যারা খাদি কাপড় বানায় তারা সহজে সুতা পাচ্ছে না। এটা সহজলভ্য করতে হবে।

২) বর্তমানে হরেক রকমের বাহারী ডিজাইনের ভিড়ে খাদির  চাহিদার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বর্তমানে মেশিনের সাথে পাল্লা দিয়ে হস্তচালিত তাঁত দ্বারা উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। ভবিষ্যতে এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে বছরে অন্তত কিছু না কিছু খাদি বা খদ্দরের জামা সকলের কেনা প্রয়োজন। এতে করে খাদি কাপড়ের চাহিদা ও যোগান বাড়তে থাকবে দিন দিন।

৩) খাদি কাপড় আমাদের দেশীয় শিল্প। অথচ পরিতাপের বিষয়, বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই এটা সম্পর্কে নূন্যতম ধারনাটুকুও নেই। তাই, এই খাদি কাপড়ের ব্যাবহার বাড়াতে এটাকে তরুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে।

৪) আমাদের দেশের এই শিল্পকে বিশ্ব সকলের সামনে   তুলে ধরতে হবে। বছরে অন্তত দুইটি প্রদর্শনী বা মেলার আয়োজন করতে হবে যা হবে পুরোটা খাদি শিল্প কেন্দ্রিক। এতে করে এর প্রচার ও প্রসার ঘটবে।

৫) দেশীয় বাজারে বিদেশী কাপড় বিশেষ করে ভারতীয় কাপড়ের অবাধ ব্যাবসা রোধ করতে হবে। এতে যেমন আমাদের দেশীয় কুটির পোশাক শিল্প এগিয়ে যাবে তেমনি খাদি শিল্পেরও প্রসার ঘটবে। কর্মসংস্থান এর সুযোগ ও তৈরি হবে।

৬) বর্তমানে খাদি কাপড় বানানোর কারিগরের সংকট পরিলক্ষিত। স্বল্প পরিসরে হলেও সরকারী বা বেসরকারী উদ্যোগে খাদি কাপড় বানানোর প্রশিক্ষনের ব্যাবস্থা করতে হবে।

৭) বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড এর দায়িত্বে  দেশে খাদির উন্নয়নে সঠিকভাবে পণ্য উন্নয়ন, বাজারজাতকরণ এবং প্রমোশন করতে পারত, সেই প্রতিষ্ঠানই হলো। এছাড়াও সরকার এবং বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলো পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে এলে খাদি কাপড় সংশ্লিষ্ট  এই সমস্যাগুলো সমাধান সম্ভব।

খাদি আমাদের দেশীয় শিল্প। এর সাথে জড়িয়ে আছে আছে বাঙালীর শত বছরের আবেগ। বিদেশী সংস্কৃতির  আগ্রাসনে আমাদের নিজ দেশীয় এই শিল্প ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। সরকারের উচিত এই শিল্পের প্রতি সুনজর দেয়া।

কুমিল্লার খাদি, ইতিহাস ও সংকটঃ

কুমিল্লা শহরের প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড়ের রামঘাটলায় গেলেই দুপাশে দেখা মিলবে খাদি বা খদ্দর শিল্পের অনেকগুলো বিক্রয়কেন্দ্র। এছাড়া নগরীর খন্দকার প্লাজার পাশেও বেশ কয়েকটি বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। জেলার চান্দিনা উপজেলায় রয়েছে বেশ কিছু খাদি পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। কুমিল্লার একটি অন্যতম ঐতিহ্য এই খাদি বা খদ্দর শিল্প।

জেনে নেওয়া যাক খাদি শিল্প সম্পর্কেঃ 

প্রাচীনকাল থেকে এই উপমহাদেশে হস্তচালিত তাঁত শিল্প ছিল জগদ্বিখ্যাত। দেশের চাহিদা মিটিয়ে সবসময় এই তাঁতের কাপড় বিদেশেও রপ্তানি হতো। একটি পেশাজীবী সম্প্রদায় তাঁত শিল্পের সাথে তখন জড়িত ছিলেন; তাদেরকে স্থানীয় ভাষায় বলা হতো ‘যুগী’ বা ‘দেবনাথ’।

চরকায় বোনা খাদির সুতাঃ 
 
খাদির দ্রুত চাহিদার কারণে দ্রুত তাঁত চালানোর জন্য পায়ে চালিত প্যাডেলের নিচে মাটিতে গর্ত করা হতো। এই গর্ত বা খাদ থেকে যে কাপড় উৎপন্ন হতো সেই কাপড় খাদি। এভাবে খাদি নামের উৎপত্তি। ক্রমান্বয়ে এই কাপড় খাদি বা খদ্দর নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে।

কুমিল্লার খাদি যেভাবে পরিচিতি পায়ঃ

ইতিহাস বলছে, ব্রিটিশ ভারতে ১৯২১ সালের দিকে গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনের সময়কালে ঐতিহাসিক কারণে এ অঞ্চলে খাদি শিল্প দ্রুত বিস্তার লাভ ও জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তখন খাদি কাপড় তৈরি হতো রাঙ্গামাটির তুলা থেকে। জেলার চান্দিনা, দেবিদ্বার, বুড়িচং ও সদর থানায় সে সময় বাস করত প্রচুর যুগী বা দেবনাথ পরিবার। বিদেশি বস্ত্র বর্জনে গান্ধীজীর আহ্বানে সে সময় কুমিল্লায় ব্যাপক সাড়া জাগে এবং খাদি বস্ত্র উৎপাদনও বেড়ে যায়। দেশের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে কুমিল্লার খাদি বস্ত্র। এই বস্ত্র জনপ্রিয়তা পায় কুমিল্লার খাদি হিসাবে।

গান্ধীজীর প্রতিষ্ঠিত অভয় আশ্রম খাদি শিল্পের প্রসারে ভূমিকা রাখেঃ 
 
গান্ধীজীর প্রতিষ্ঠিত কুমিল্লার অভয় আশ্রম খাদি শিল্প প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনুশীলন চক্রের আশ্রয়স্থল হিসেবে ছদ্মবরণে প্রতিষ্ঠিত সমাজ কল্যাণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে অভয় আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদেশি কাপড় বর্জনের ডাকে যখন ব্যাপক হারে চরকায় সুতা কাটা শুরু হয়। অভয় আশ্রম তখন সুলভে আশ্রমে তৈরি চরকা বাজারে বিক্রির পাশাপাশি নিজেরাও তৈরি করতে থাকে খাদি বস্ত্র। বিভিন্ন গ্রামে তৈরি খাদি বস্ত্রও এ সময় অভয় আশ্রমের মাধ্যমে বাজারজাত করতে শুরু করে।

খাদি কাপড়ের তৎকালীন মূল্য যেমন ছিলঃ

জানা যায়, ১৯২৬-২৭ সালে একটি ৮ হাত লম্বা ধূতি বিক্রি হতো মাত্র পাঁচসিকে দামে। সে সময় কুমিল্লা অভয় আশ্রম প্রায় ৯ লাখ টাকা মূল্যের খাদি কাপড় বিক্রি করেছিল। প্রয়াত রবীন্দ্রসংগীত বিশারদ, অভয় আশ্রমের একজন কর্মী পরিমল দত্তের লেখা থেকে জানা যায়, বিপুল চাহিদা থাকলেও অভয় আশ্রম থেকে সে চাহিদা সম্পূর্ণভাবে পূরণ হতো না।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে খাদি শিল্পের অবস্থাঃ

স্বাধীনতা পরবর্তী সময় খাদি শিল্পের ছিল স্বর্ণযুগ। এর পরপরই আসে সংকটকাল। যুদ্ধ বিধ্বস্ত বস্ত্রকলগুলো তখন বন্ধ। বস্ত্র চাহিদা মেটাতে আমদানি নির্ভর দেশে হস্তচালিত তাঁতের কাপড়ের ওপর প্রচুর চাপ পড়ে। দেশের বা মানুষের চাহিদার তুলনায় খাদির উৎপাদন ব্যাপক না হলেও চান্দিনা বাজারকে কেন্দ্র করে আশপাশের গ্রামগুলোতে তাঁতীরা চাদর, পর্দার কাপড়, পরার কাপড় তৈরি করতে শুরু করে।

খাদি আছে যুগযোপযোগী রূপেওঃ 
 
স্বাধীনতার আগে খাদির চাহিদা শীত বস্ত্র হিসেবেও ব্যাপক ছিল। খাদি বস্ত্রের চাহিদের সুযোগে এ অঞ্চলের কতিপয় অসাধু ব্যক্তি অতীত সরকারের দেওয়া সুতা, রঙের লাইসেন্স গ্রহণের সুবাদে মুনাফা লুটে নেয় মধ্যস্বত্ব ভোগী হিসেবে। সুলভ মূল্যে সুতা ও রঙের অভাবে প্রকৃত তাঁতীরা সে সময় তাঁত বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন।

খাদির বর্তমান অবস্থাঃ

কুমিল্লা জেলার সাথে খাদিশিল্প আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। একসময় এই খাদির খুব প্রচলন ছিল। কুমিল্লায় আগে গান্ধী অভয়াশ্রমে এ খাদি তৈরি হতো। কুমিল্লা শহরের চান্দিনা উপজেলায় এখনও গান্ধীজীর স্মৃতিবিজড়িত তাঁত রয়েছে। বর্তমানে কুমিল্লার খাদিপণ্যের বিক্রয়কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ‘খাদি কটেজ’, ‘পূর্বাশা গিফট এন্ড খাদি’, ‘খাদি হাউজ’, ‘খাদি আড়ং’, ‘গ্রামীণ খাদি’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

কুমিল্লা জেলার সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে খাদিঃ 
 
যা বললেন চান্দিনার ‘গ্রামীণ খাদি’র মালিক
কুমিল্লা জেলার চান্দিনায় অবস্থিত ‘গ্রামীণ খাদি’র সত্ত্বাধিকারী অরুণ গুহর সাথে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে খাদির কাপড়ের যথেষ্ট চাহিদা না থাকলেও দেশে এবং বিদেশে ছোট-ছোট লটে খাদি পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। ফ্রান্স, স্পেন, ডেনমার্ক, তুরস্কসহ বেশ কয়েকটি দেশে এই পণ্য রপ্তানি হয়। বর্তমানে এই শিল্প টিকে থাকলেও অদূর ভবিষ্যতে এর অস্তিত্ব নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তুলার অপর্যাপ্ততা এবং চাহিদার সীমাবদ্ধতা। বর্তমানে মেশিনের সাথে পাল্লা দিয়ে হস্তচালিত তাঁত দ্বারা উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। ভবিষ্যতে এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে বছরে অন্তত একটি করে হলেও খাদি বা খদ্দরের জামা সকলের কেনা প্রয়োজন বলে তিনি জানান।

এছাড়াও সরকার এবং বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলো পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে এলে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক কুমিল্লার খাদি শিল্পের একাল সেকালঃ

কুমিল্লাতেই আমার জন্ম ৷ ছোট কাল থেকেই এই জেলার বিখ্যাত অনেক কিছুর সাথেই পরিচিত হয়েছি ৷ কুমিল্লার বিখ্যাত রসমালাই, দর্শনীয় স্থান, নজরুলের বাড়ি, খাদি শিল্প, তাদের মধ্যে অন্যতম ৷হঠাৎ করে ফেইসবুকে চোখে পড়লো খাদি বাজার নামে একটি অনলাইন শপ যারা কিনা কুমিল্লার খাদি পণ্য অনলাইনে বিক্রয়ের উদ্যেগ নিয়েছে ৷ উদ্যেগটা বেশ ইউনিক মনে হলো ৷ সেই থেকে ভাবলাম একটু খাদির ইতিহাসটা তুলেই ধরি ৷

প্রাচীনকাল থেকেই এ উপমহাদেশের হস্তচালিত তাঁত শিল্প জগদবিখ্যাত ছিল। ঢাকাই মসলিনের মতো বিখ্যাত ছিল কুমিল্লার খাদি। তখন খাদি কাপড় বিদেশেও রপ্তানি হতো। এখনও হয় তবে যৎসামান্য। বর্তমানে খাদির বেডসিট, ব্লক করা থ্রীপিস, পাঞ্জাবী, ইত্যাদি ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বর্তমানে যে কাপড় খাদি নামে পরিচিত প্রথমে এটি অন্য নামে পরিচিত ছিল। কেননা খাদি কোন কাপড়ের নামও নয় সুতার নামও নয়। দেশীয় কাপড় হিসেবে এ ধরনের কাপড়ের চাহিদা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় পায়ে চালিত প্যাডেলের নীচে মাটিতে খাঁদ বা গর্ত করা হতো। এই গর্ত বা খাঁদ থেকে যে কাপড় উৎপন্ন হতো তাকেই খাদি কাপড় বলা হতো। এখন মেশিনে তৈরি এ ধরণের কাপড় ও খাদি কাপড় নামে পরিচিত। খাদি শিল্পের বিকাশে চান্দিনার শৈলেন গুহ ও তার ছেলে বিজন গুহ চান্দিনাতে আখতার হামিদ খান প্রতিষ্ঠিত”দি খাদি কো অপারেটিভ এসোসিয়েশন লিমিটেডে”র হাল ধরেন। ১৯৬৫-৬৮ সালে আখতার হামিদ খানের চেষ্টায় ভাল মানের তুলা পাওয়া যেত। ভাল তুলার অভাবে পরে উন্নতমানের খাদি তৈরি অসম্ভব হয়ে পড়ে। বর্তমানে খদ্দরের উন্নয়নে কাজ করছেন তার ছেলে অরুন গুহ। খদ্দরের উজ্জ্বলতা নেই। বাহ্যিক চাকচিক্য নেই। আছে স্বদেশ প্রেমের পরিচয়। সরকারর পৃষ্ঠ পোষকতার অভাবে খাদি শিল্প মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছেনা। খাদি নিয়ে শৈলেন গুহের বরাবরই আকুতি ছিল। তা হলো আপনারা এই খদ্দর কাপড় ব্যবহার করে খদ্দর শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখুন। সেটাই করে চলছেন অরুন গুহ।

স্বদেশী আন্দোলনের সসময় খাদি কাপড়ের চাহিদা অসম্ভব ভাবে বেড়ে যায়। তখন মানুষ বিদেশী পন্য বর্জন করে দেশীয় কাপড়ের প্রতি আর্কষ্ট হয়। বিশেষ করে মহাত্মা গান্ধীর অনুপ্রেরণায় কুমিল্লার খাদির বাজার আরো প্রসারিত হয়। চান্দিনায় মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতি বিজড়িত একটি তাঁত এখনও রয়েছে। আদি খাদি তৈরি করা হতো রাঙ্গামাটির তুলা দিয়ে। আর এখন তৈরি হয় তুলা এবং মেশিনে তৈরি সুতার মিশ্রণে। কুমিল্লা সদর, চান্দিনা, দেবিদ্ধার ও মুরাদনগরের হাজার হাজার তাঁতী এ শিল্পের প্রসারে কাজ করছে। বর্তমানে অল্প কিছু তাঁতী কোন রকমে তাদের পেশা টিকিয়ে রেখেছে। চান্দিনার বারেরা , নূরীতলা ও কলাগাঁওয়ে কিছু কিছু পরিবার তুলা থেকে সুতা বানানোর কাজ করে। খাদি শিল্পীরা ওদের নিকট থেকে সুতা কিনে খাদি তৈরি করে। তবে বর্তমানে শুধু তুলার সুতা দিয়ে খাদি উৎপাদিত হয়না। খাদি সুতার সাথে নারায়নগঞ্জ থেকে সুতা এনে সেই সুতার মিশ্রনে কারিগররা খাদি তৈরি করছে। ফলে খাদির আদি রুপ বদলে গিয়েছে এবং খাদি কাপড় পরে আগের মতো আরাম পাওয়া যায় না।

বর্তমানে দেবিদ্ধার , মুরাদনগর ও চান্দিনার তাঁতীরা কাপড় বুনায় ব্যস্ত। দেবিদ্ধারের বরকামতায় শ্রীনিবাসের ২টি , মতিলাল দেবনাথের ১টি , রনজিত দেবনাথের ৭টি ভুবন দেবনাথের ১টি, চিন্তা হরণ দেবনাথের ২টি তাঁত ছিল। বর্তমানে ভুবন দেবনাথের ১টি রনজিত দেবনাথের ৫টি চিন্তা হরণ দেবনাথের ২টি তাঁত রয়েছে। বাকীগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। কারিগড়দের পাশাপশি তাদের ছেলে -মেয়ে –বউরাও কাজ করে। কিভাবে খাদি তৈরি হয়? এ প্রশ্নের জবাবে মতিলালের বউ বল্লেন-৬০ কেজি ওজনের একেকটি গাইট এনে ভাত বা ময়দার মার দিয়ে ১ ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে রোদে শুকিয়ে ঝরঝরা করা হয়। তারপর আরো কয়েকেটি ধাপ পেড়িয়ে গজ কাপড় উৎপাদিত হয়। বর্তমানে খাদি তৈরির সুতাসহ সব ধরণের সুতার দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে দেবিদ্ধারের তাঁত শিল্প হুমকির সম্মুখিন। জানা গেছে দুই/তিন সপ্তাহের ব্যবধানে তাঁতের তেনা তৈরিতে ব্যবহৃত ৮২/১ পোড়ন সুতা বেল প্রতি ১ লাখ টাকার পরিবর্তে ১ লাখ ১২ হাজার টাকা , ৭৪/১ সুতা বেলপ্রতি ৯৮ হাজার টাকার পরিবর্তে ১ লাখ ১৪ হাজার টাকট। ৬২/১ সুতা বেল ৯৪ হাজার টাকার পরিবর্তে ১ লাখ ৪ হাজার টাকা। ৫৪/১ সুতা বেল প্রতি ৮৮ হাজার টাকার পরিবর্তে ৯৬ হাজার টাকা , ৪০/১ সুতা বেল প্রতি ৭০ হাজার টাকার পরিবর্তে ৮৪ হাজার টাকায় বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ঈদ একই সময়ের ব্যবধানে ৮০ এর কুন সুতা পাউন্ড প্রতি ২৩০ টাকার স্থলে ২৬০ টাকা , ৬০ এর কুন সুতা পাউন্ড প্রতি ২২৫ টাকার স্থলে ২৬০ টাকা , ৫০ এর কুন সুতা ১৭১ টাকা পাউন্ড এর সবথলে ১৯০ টাকা বিক্রি হচ্ছে । এছাড়া ৩২ সুতা বন্ডিলের দাম ৬ শ টাকা থেকে ১৪ শ টাকা এবং রেলিং সুতা ৪০০টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১শ টাাকা করা হয়েছে। বর্তমানে বরকামতার চাদর , লুঙ্গি , থান কাপড় , ইতাদি তৈরি হয়। রনজিত দেবনাথের বাবা শশীমোহন দেবনাথ সাইতলায় ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ৭০/৭৫ বছর ধরে এ ব্যবসা চলছে। তিনি জানান-স্বাধীনতার পর পর এ ব্যবসার স্বর্ণ যুগ ছিল। মুরাদনগরের জাহাপুর , ইসলামপুর , বাখরনগরসহ সকল তাঁতীরা চায় এব্যবসার সুদিন আবার ফিরে আসুক। কিন্তু কাঁচামালের দাম বৃদ্ধিও কারেণে স্বল্পপঁজির উৎপাদনকারীরা ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে খাদিপাড়া আবার জেগে উঠবে।


সোর্সঃ 
Barta24 24x7 
somewhere in net ltd.

খাদি শিল্প | খাদি কাপড় | Khadi Fabrics

তাঁত শিল্প: বিবর্তনের ধারায়
প্রচলিত অর্থে বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো ও বৃহত্তম শিল্প হলো তাঁত। সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এ অঞ্চলে তাঁত শিল্পের প্রচলন শুরু হয়। তাঁত শিল্পে মণিপুরিরা অনেক আদিকাল থেকে তাঁতবস্ত্র তৈরি করে আসছে। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো টাঙ্গাইল জেলা সুপ্রাচীন ঐতিহ্যে প্রসিদ্ধ। সম্প্রতি দু-তিন বছর ধরে পাওয়ারলুমে শান্তিপুরের তাঁত শাড়ি উৎপাদন শুরু হয়েছে ব্যাপকভাবে। একই সুতায় রঙ-ডিজাইন করে উৎপাদন হচ্ছে শাড়ি।

১৯৯০ সালে নরসিংদী জেলায় সবচেয়ে বেশি ২০ হাজারের মতো তাঁত ছিল। গত ২৮ বছরে তা কমে টিকে আছে মাত্র এক হাজার। হোসিয়ারি শিল্পের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ১৯১৮ সালে পাবনা শহরের আশপাশে তাঁত শিল্পের বিকাশ ঘটে। তাঁত শিল্পের প্রয়োজনে সুতা, রঙ ও রাসায়নিক দ্রব্যের বাজারও পাবনায় গড়ে ওঠে।

১৯২২ সালে নেতাজি সুভাষ বসু একবার পাবনায় আসেন। এ সময় তিনি পাবনায় সাতটি হোসিয়ারি শিল্প পরিদর্শন করেন। তিনি এ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো দেখে মুগ্ধ হন। এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত দ্রব্যের মান ও চাহিদা দেখে তিনি এ শিল্পকে বস্ত্র শিল্পের ‘মা’ বলে আখ্যায়িত করেন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও পাবনায় হোসিয়ারি শিল্পের উৎপাদিত দ্রব্য গেঞ্জি, পাবনার তাঁত শিল্পের শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা ব্যবহার করতেন। বর্তমানে পাবনা জেলায় প্রায় ৫০০ হোসিয়ারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে। এসব প্রতিষ্ঠানে বহু শ্রমিক নিয়োজিত। পাবনায় তৈরি গেঞ্জি বর্তমানে নেপাল, ভারত, ভুটান, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে ঢাকা মারফত রফতানি হয়।


তাঁত শিল্পের উদ্ভব সঠিক কবে থেকে তা বলা মুশকিল। ইতিহাস থেকে জানা যায়, আদি বসাক সম্প্রদায়ের তাঁতিরাই হলো আদি তাঁতি। এরা আদিকাল থেকে প্রধানত তাঁত বুনে আসছে। এ পোশাক শিল্পের সাথে যুক্ত মানুষ তন্তুবায় বা তাঁতি নামে পরিচিত। এরা প্রধানত যাযাবর শ্রেণীর অন্তর্গত ছিল। প্রথমে এরা সিন্ধু উপত্যকার অববাহিকায় বসবাস করত, কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তারা সে স্থান পরিত্যাগ করে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে এসে তাঁতের কাজ শুরু করে। আবহাওয়া প্রতিকূলতার কারণে পরে তারা রাজশাহী অঞ্চলে চলে আসে। তাঁত শিল্পের ইতিহাস থেকে জানা যায়, মণিপুরে অনেক আগে থেকেই তাঁত শিল্পের কাজ হয়ে আসছে। মণিপুরিরা মূলত নিজেদের পোশাকের প্রয়োজনে তাঁতের কাপড় তৈরি করত। তাদের তৈরি তাঁতের সামগ্রী পরবর্তীকালে বাঙালি সমাজে খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

কুটির শিল্প হিসেবে হস্তচালিত তাঁত শিল্প ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পূর্বকালে কেবল দেশেই নয় বহির্বাণিজ্যেও বিশেষ স্থান দখল করেছিল। বংশপরম্পরায় দক্ষতা অর্জনের মধ্য দিয়ে বয়ন উত্কর্ষতায় তাঁতিরা সৃষ্টি করেছিল এক অনন্য নিদর্শন।

দেশের সর্ববৃহৎ কাপড়ের হাট নরসিংদীর শেখের মাঠ ও গ্রামে গড়ে ওঠেছিল যা, তা বাবুর হাট নামে পরিচিত। দেশের বিভিন্ন স্থানে হস্তচালিত তাঁতে কাপড় বোনা হলেও বাণিজ্যিকভাবে শেখের কাপড়ের সমকক্ষ কেউ নেই। সুলতানি ও মোগল যুগের উত্তরাধিকারী হিসেবে এখনকার তাঁতিদের বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁতের রঙ, নকশা, বুনন পদ্ধতি অন্যান্য এলাকা থেকে আলাদা।

একসময় তাদের পূর্বপুুুরুষরাই জগদ্বিখ্যাত মসলিন, জামদানি ও মিহি সুতি বস্ত্র তৈরি করে সারা বিশ্বে বাংলা তথা ভারতবর্ষের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছিল।

সুপ্রাচীকাল থেকে সিরাজগঞ্জের শাড়ি এ দেশের ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে আসছে। সিরাজগঞ্জের দক্ষ কারিগরেরা বংশানুক্রমে এ শাড়ি তৈরী করছেন। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা ও হিউয়েন সাঙের ভ্রমণ কাহিনীতে সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের শাড়ির কথাটি উল্লেখ রয়েছে। তাঁতিরা ঠিক কবে থেকে সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে শাড়ি তৈরি করছেন সে ইতিহাস সঠিকভাবে অজানা থাকলেও এ অঞ্চলের শাড়ির একটি ঐতিহ্য চলমান রয়েছে। বসাক শ্রেণীর তাঁতপল্লীর তাঁতিরা বংশানুক্রমে হাজার বছর ধরে এ শাড়ি তৈরি করে চলেছেন। এখানকার তাঁতিরা শুধু সুতি সুতাকে উপজিব্য করে নিজের দক্ষতায় তৈরি করেন তাঁতের শাড়ি, যা বেশ আরামদায়ক, মার্জিত ও রুচিশীল। এখানকার শাড়ির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো পাড় বা কিনারের কাজ। তবে ৯০ দশকে এখানকার শাড়ি তৈরিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। সে সময় তৈরি কটন শাড়ির পাশাপাশি সফটসিল্ক ও হাফসিল্ক শাড়ি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে যুগোপযোগী নকশায় এখন তাঁতের শাড়ি তৈরি হচ্ছে। একটি শাড়ি তৈরি করতে কী পরিমাণ পরিশ্রম করতে হয়, এর সাথে তাঁতের শাড়ির পরতে পরতে সংশ্লিষ্টদের কী পরিমাণ মমতা জড়িয়ে আছে, সে কথা আজও অনেকের কাছে অজানা। তাঁতে তৈরি শাড়ি যেকোনো নারীর ব্যক্তিত্ব প্রকাশে সক্ষম। সময়ের সাথে পরিবর্তিত অবস্থায় আধুনিক নারীর রুচি, পছন্দ ও বৈচিত্র্যের পরিবর্তন ঘটেছে। সেই সাথে সংগতি রেখে তৈরি হচ্ছে কারুকার্যখচিত আধুনিক নকশাসমৃদ্ধ তাঁতের শাড়ি। তাঁতে তৈরি হচ্ছে তাঁতের সুতির শাড়ি, দেবদাস, আনারকলি, জামদানি, সুতি জামদানি, জরি পাড়, স্বর্ণচূড়, কুমকুম, সানন্দা, কটকি, সুতিপাড়, নিলাম্বরী, ময়ূরকণ্ঠী, হাজারবুটি, ইককাত, সিল্ক, মণিপুরি, সুতিসিল্ক, হাফসিল্ক, বালুচরি, শান্তিপুরি, সফটসিল্ক, আধা রেশমি, গ্রামীণ চেকসহ নানা বাহারের ও নামের শাড়ি। আগে পদ্মপাড়, মাধবীলতা, মরবী, তেরবী, কুঞ্জলতা ও লতাপাতা পাড়ের শাড়ি তৈরি করা হলেও এখন তাঁতিরা পাড়ে পরিবর্তন এনেছেন। তাঁতে নারী ও পুরুষ উভয়ই কাজ করেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় বড় মার্কেট, সপিংমলে শোভা পাচ্ছে সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্য নয়ন কাড়া এসব বাহারি তাঁতের শাড়ি ও থ্রি-পিস।

দেশের শাড়ি ও পোশাকের সিংহভাগ পূরণ করছে সিরাজগঞ্জের তাঁতের তৈরি শাড়ি ও পোশাক। বিদেশীরা ক্রয় করছেন সিরাজগঞ্জের তৈরি তাঁতের শাড়ি। শুধু বাঙালি বধূ ও ললনাদের পরিধানের বস্ত্র হিসেবে নয়, বিভিন্ন উৎসবে কিংবা ব্যক্তিগত উপহার হিসেবে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশীদের কাছেও আকর্ষণীয় উপহার হিসেবে স্থান করে নিয়েছে যমুনার পাড়ে তৈরি নজর কাড়া তাঁতের শাড়ি। উপহার হিসেবে দেয়া হয় তাঁতের শাড়ি। মান, বুনন, নকশার তারতম্য ভেদে ৪০০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা মূল্যমানের শাড়ি তৈরি করা হচ্ছে। অর্ডার দিলে ১০-২০ হাজার টাকা মূল্যমানের শাড়ি তৈরি করে দিচ্ছেন তাঁত মালিকরা। তবে জামদানি ও সিল্ক শাড়ির দাম অন্য শাড়ির তুলনায় একটু বেশি। জেলার শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, সদর, কামারখন্দ, বেলকুচি, রায়গঞ্জ, চৌহালী, কাজিপুরে তাঁত কারখানার সংখ্যা ১ লাখ ৩৫ হাজারের অধিক। এ শিল্পে জড়িত আছেন আট-নয় লাখ শ্রমিক, মালিক ও কর্মচারী। প্রতি বছর এ জেলায় হস্তচালিত তাঁত থেকে প্রায় ২৩ কোটি মিটার বস্ত্র উৎপাদন হয়।

আধুনিক প্রযুক্তির উন্নতির ফলে বিদ্যুতের সাহায্যে চালিত পাওয়ারলুম চালু হলে এর মাধ্যমে কাপড় তৈরি শুরু হলেও হস্তচালিত তাঁত ও পাওয়ারলুমের সমন্বয় তাঁত শিল্পকে অনেকটা সমৃদ্ধ করেছে। এর মাধ্যমে কাপড়ের পাড়ে মনোমুগ্ধকর সব নকশা করা হচ্ছে। মূলত পাড়ের নকশার ওপর ভিত্তি করে কাপড়ের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে এবং কাপড় আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তবে কালের বির্বতনে তাঁতের শাড়ির নকশা এখন অনেকটাই আধুনিক হয়ে একদিকে যেমন অভিনবত্ব এসেছে, তেমনি চমত্কারিত্ব ও গুণে-মানে হয়েছে খুবই উন্নত। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, এনায়েতপুর, বেলকুচি, সদর, উল্লাপাড়া উপজেলাসহ যমুনা নদীর তীরঘেঁষা প্রায় ৫০ কিলোমিটার এলাকা তাঁত শিল্প হিসেবে পরিচিত। তাঁত শিল্পকে ঘিরে এখানে গড়ে উঠেছে দেশের বৃহৎ শাহজাদপুর কাপড়ের হাট, মুকন্দগাতী (সোহাগপুর), এনায়েতপুর ও জেলা সদরের নিউমার্কেট কাপড়ের হাট। এসব হাটে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কাপড়ের ব্যবসায়ীরা কাপড় কেনার জন্য আসছেন, তেমনি এ হাটগুলো তাঁত উপকরণ ক্রয়-বিক্রয়ের অন্যতম স্থান। তাঁত সাধারণত দুই প্রকার—দেশী ও চিত্তরঞ্জন। দেশী তাঁতে সাধারণত গামছা, চাদর প্রভৃতি তৈরি হয়। আর চিত্তরঞ্জন তাঁতে ১০০ কাউন্টের সুতার উন্নত মানের ধুতি, মনোমুগ্ধকর শাড়ি, চাদর, লুঙ্গিসহ প্রায় সব ধরনের কাপড়ই প্রস্তুত হয়। চিত্তরঞ্জন তাঁতের বড় সুবিধা হলো দ্রুত কাজ হয়, সময় কম লাগে। সুতা কাটে কম এবং তাঁতির পরিশ্রম কম হয়। 

কিন্তু নানা প্রতিকূলতায় অনেকটা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে তাঁত শিল্প। আবহমান বাংলার তাঁতের শাড়ি এ দেশের কুটির শিল্পের অন্যতম একটি উপকরণ হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন অসুবিধার কারণে ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প এখন প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। গুণে-মানে উন্নত চাহিদার উত্তরোত্তর বৃদ্ধির কারণে তাঁতিদের এ পরিশ্রমকে অনেকে পুঁজি করে নজরদারির অভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এখানে তৈরি করা শাড়িতে নিজেদের কোম্পানির সিল মেরে নিজেদের তৈরি বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। ফলে শাড়ি এবং এখানকার তাঁতিদের প্রকৃত মূল্যায়ন হচ্ছে না, যা নীতিনৈতিকতাবিরোধী। ভাল ও উন্নত মানের সুতা দেশে তৈরি না হওয়ায় চোরাপথে আসা এবং ভারতের তৈরি (১০০ কাউন্ট) সুতাই এখন তাঁত শিল্পের প্রধান ভরসা। কিন্তু আমদানিকারকদের সিন্ডিকেটের কারণে ভারতীয় সুতা উচ্চমূল্যে কিনতে হয়। এর কারণে উৎপাদন খরচ বেশি পড়ে। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদকদের প্রতিনিয়ত সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

দক্ষ শ্রমিকের অভাবে আধুনিক চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে মানসম্মত প্রয়োজনমতো পোশাক তৈরি করা যাচ্ছে না। তাঁত শ্রমিকদের সময়োপযোগী কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় গতানুগতিক সনাতন পদ্ধতিতে পোশাক তৈরির ধারার বাইরে এসে আধুনিক রুচিসম্মত পোশাক তৈরি করতে কষ্ট হচ্ছে। এছাড়া মূলধনের সমস্যা তো রয়েছেই। তাঁত শিল্পে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা একেবারেই কম। পৃষ্ঠপোষকতা ও নজরদারির অভাবে ঐতিহ্য হারাতে বসেছে তাঁত শিল্প। সরকারিভাবে মোটা অংকের ঋণপ্রাপ্তির কোনো সুযোগ না থাকায় দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ গ্রহণ করতে হচ্ছে তাঁত মালিকদের। মূলধনের অভাবে অনেক তাঁত এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। তাঁতকে সিরাজগঞ্জের ব্র্যান্ড হিসেবে নিয়েছে সরকার। তাই তাঁত শিল্প রক্ষায় এ শিল্পের জন্য সুতাসহ সব উপকরণের সহজলভ্যতা ও পর্যাপ্ত ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সাথে তাঁত শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং তাঁত শিল্পের অসুবিধাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

অশোক ব্যানার্জী
অশোক ব্যানার্জী: সাংবাদিক
বনিকবার্তা

তাঁত শিল্প: বিবর্তন ইতিহাস | History of Handloom Industry

সিল্কের কাপড়: পরিচয় ও পরিধানের হুকুম
‘সিল্ক’ ইংরেজি শব্দ, বাংলায় রেশম। আরবিতে হাড়ির, দীবাজসহ আরো কিছু শব্দ ব্যবহারিত হয়। যেমন রাসূল সা. হাদিসে বলেন, أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ: ‏’لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّونَ الْخَزَّ وَالْحَرِيرَ‘ -وَذَكَرَ كَلاَمًا قَالَ ‏”‏ يُمْسَخُ مِنْهُمْ آخَرُونَ قِرَدَةً وَخَنَازِيرَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ ‏

এখানে রাসূল সা. হাঁড়ির শব্দ ব্যবহার করেছেন। রেশম পোকা দিয়ে তৈরি সুতার কাপড়কে সিল্কের কাপড় বা রেশম কাপড় বলা হয়। কখনো কখনো রেশম পোকা ব্যতীত অন্য পোকা দ্বারাও রেশমের কাপড় তৈরি করা হয়।

বস্ত্রশিল্পে সিল্ক বা রেশম কাপড়ের একটি ঐতিহ্য এবং মান রয়েছে। বিশ্বে প্রচলিত হরেক রকমের রেশম কাপড়ের অস্তিত্ব বিদ্যমান আছে। সেগুলোর রয়েছে নামের বৈচিত্র। আর তার সাথে রয়েছে রঙের বৈচিত্রও। এর কিছু আছে আঞ্চলিকভাবে পরিচিত। আর কিছু আছে বিশ্বময় সমাদৃত।

যেমন ধরা যাক-

১. তুঁত সিল্ক, তুঁত সিল্ক বিশ্বজুড়ে সর্বাধিক সাধারণ এবং বহুল ব্যবহৃত রেশম। 

২.তসর সিল্ক, তসর বা তুষাহ সিল্ক হল এক প্রকার বুনো রেশম; যা তুঁতকৃমি ব্যতীত শুঁয়োপোকা দ্বারা উত্পাদিত হয়। 

৩. এরি সিল্ক, এন্ডি বা এরান্দি সিল্ক নামেও পরিচিত। এটি ক্রিমযুক্ত সাদা রঙের সিল্ক। 

৪. মুগা সিল্ক, মুগা রেশম সোনালি হলুদ বর্ণের। মুগা রেশমকৃমিও তাসর সিল্কওয়ার্মার মতো একই বংশের অন্তর্ভুক্ত। 

৫. স্পাইডার সিল্ক, স্পাইডার সিল্ক একটি নন-পোকামাকড় রেশম জাত যা টেক্সচারে নরম এবং সূক্ষ্ম। মাকড়শা রেশম পোকার মতো জন্মাতে পারে না এবং রেশম পোকার মতো সূতাও উত্পাদন করে না বলে এটি উত্পাদন করা সবচেয়ে কঠিন রেশম।

৬. ঝিনুক সিল্ক, অ্যাড্রিয়াটিকের ইটালিয়া এবং ডালমাটিয়ার তীরে অগভীর জলে পাওয়া বিভালভ থেকে ঝিনুকের রেশম পাওয়া যায়। এটি সমুদ্রতীরে পাওয়া ঝিনুক দ্বারা উত্পাদিত হওয়ায় এটি প্রায়শই ‘সমুদ্র সিল্ক’ নামে অভিহিত হয়। 

৭. আনফে সিল্ক, অনাফ সিল্ক সাধারণত দক্ষিণ এবং মধ্য আফ্রিকার দেশগুলিতে উত্পাদিত হয়। 

৮. কোয়ান সিল্ক, কোচ সিল্ক পাচিপাসা অ্যাটাসের লার্ভা থেকে উত্পাদিত হয় যা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ইটালি, গ্রিস এবং তুরস্ক জুড়ে প্রচলিত। এছাড়াও বিশ্বে প্রচলিত রেশম কাপড়ের আরো বিভিন্ন নাম রয়েছে।

আমাদের সমাজের মধ্যে প্রচলিত দুই ধরনের সিল্কের কাপড় রয়েছ। একটি প্রকৃত রেশম পোকা দিয়ে তৈরি। আরেকটি মেশিন দ্বারা তৈরি। যা দেখতে একেবারে রেশমের মতোই। এটাকেও সিল্কের কাপড় বলে মার্কেটে বাজারজাত করা হয়।

কিন্তু প্রকৃত রেশম কাপড়ের ব্যাপারে শরীয়তের হুকুমে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মেশিনের সাহায্যে উৎপাদিত নকল রেশম বা কৃত্রিম সিল্কের কাপড় পরিধানের ব্যাপারে শরীয়তে কোন বাধা নিষেধ করেনি।

আর পূর্বে উল্লেখিত আট প্রকার রেশম কাপড়ের সবগুলোই প্রকৃত রেশমের অন্তর্ভুক্ত। নামের ভিন্নতা থাকলেও হুকুমের দিক দিয়ে এগুলো এক ও অভিন্ন। তাই এসব সিল্ক বা রেশম কাপড়ের হুকুম হচ্ছে,

‘সিল্কের তৈরি কাপড় কিংবা যে কাপড়ে প্রস্থের সুতা (যাকে আমরা তানা বলে থাকি) সিল্ক হলে, তা পুরুষের জন্য ব্যবহার করা বৈধ নয়।’

এ ব্যাপারে হজরত আলি রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সা. কে দেখেছি, তিনি ডান হাতে রেশম ধরলেন এবং বাম হাতে স্বর্ণ, এরপর বললেন, ‘আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য এ দুটি বস্তু হারাম।’ (আবু দাউদ: ৪০৫৭, নাসায়ি: ৫১৪৪,ইবনু মাজাহ: ৩৫৯৫, ফতুয়ায়ে হিন্দিয়া: ৫,৩৮৩, ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ২৭, ৪২১)

তবে প্রকৃত রেশম কাপড়ের তিন চার আঙুল পরিমাণ হাবাকাবা, শিরওয়ানী, অথবা জামার চারপাশে ব্যবহার করার অনুমতি আছে।

আর রেশম কাপড় মহিলাদের ব্যবহারের জন্য ইসলামে কোনো বাধা-নিষেধ নেই ।

এ ব্যাপারে হজরত আলি রা. বলেন, নবিজী সা. আমাকে একজোড়া রেশমি কাপড় দিলেন। আমি তা পরিধান করলাম। এতে নবিজীর মুখমণ্ডলে গোস্বার ভাব ফুটে উঠল। ফলে আমি তা মহিলাদের মাঝে ভাগ করে দিয়ে দিলাম। (সহিহ বুখারি: ২৬১৪, মুসনাদে আহমদ: ১১৭১)

শেষ জামানার পাপের দিকে ইঙ্গিত করে রাসুলুল্লাহ সা. আরও বলেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক আসবে, যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল সাব্যস্ত করবে।’ (সহিহ বুখারি: ৫৫৯০) আল্লাহ তায়ালা এ লানত থেকে আমাদের রক্ষা করুন। আমিন।

সিল্কের কাপড়: পরিচয় ও পরিধানের হুকুম | silk fabrics

জিও টেক্সটাইল | Geo Textile

জিও টেক্সটাইল কি ? 

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং নতুন বিপ্লব জিওটেক্সটাইল , বিভিন্ন বড় বড় সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রজেক্ট এ বহুল ভাবে ব্যাবহার হচ্ছে এই জিও-টেক্সটাইল । রাস্তা, বাঁধ ,নদী ভাঙ্গন , মাস ফাউন্ডেশন,পাহাড় ধ্বস ,ড্রেইনেজ, নদী-খাল ও কোস্টাল ওয়ার্ক এ ব্যাবহার হয় এই জিওটেক্সটাইল। তাহলে আজকে জানি জিওটেক্সটাইল সম্পর্কে বিস্তারিত ।

 

জিও টেক্সটাইল :

জিও টেক্সটাইল প্রোডাক্ট মূলত পলিস্টার, পলিপ্রপিলিন, পলিঅ্যামাইড দিয়ে তৈরি করা হয়। জিও টেক এর সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় সিভিল / কনস্ট্রাকশনের কাজে। এতে মাটির বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে দূর্বল ও অকার্যকর জায়গায় ভবন নির্মাণ এর উপযোগি করে তুলে। আধুনিক সিভিল /কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এ বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে এই জিও টেক্সটাইল।

 
জিও টেক্সটাইল কি ?

জিওটেক্সটাইল’ হলো এক ধরনের টেকনিক্যাল টেক্সটাইল (দেখতে অনেকটা চালের বস্তার মতো), যা মাটির উপরিভাগে বা অভ্যন্তরে ব্যবহার করে পুরকৌশলগত (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং) সুবিধা পাওয়া যায়।

জিওটেক্সটাইল এক ধরনের পলিমার ফেব্রিক যেটা বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা যেমন রাস্তা, ড্রেন, গৃহায়ন এবং বাঁধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও এটা স্থাপত্য প্রকৌশলীর আরও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হয়।

 

জিও টেক্সটাইলের সুবিধাসমুহ ?

জিওটেক্সটাইল পণ্যের বিভিন্ন সুবিধাসমূহ নিম্নে বর্ণিত হল:-

১. জিওটেক্সটাইল দ্বারা তৈরিকৃত ফেব্রিক ওভেন ফেব্রিকের তুলনায় হালকা হয়। ফলে এটা হ্যান্ডেলিং করা সহজ হয় এবং পরিবহনের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পাওয়া যায়।

২. ওয়েফট নিবেশে তৈরি ফেব্রিকের ক্ষেত্রে জিওটেক্সটাইল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করে। জিওটেক্সটাইল এই ধরনের ফেব্রিকের ক্ষেত্রে বিদীর্ণকরণ শক্তি বৃদ্ধি করে।

 
৩. রাস্তা তৈরিতে পিচ এবং টুকরা ইট এই দুই স্তরের মাঝে জিওটেক্সটাইল ফেব্রিক ব্যবহার করলে রাস্তা বৃষ্টির পানিতে ক্ষয়ে পড়ার হাত থেকে রক্ষা পায়।

৪. মাটির দুই স্তরের পার্থক্যকারী হিসাবে জিওটেক্সটাইল বিপুল পরিমাণে ব্যবহৃত হয়।

৫।। আর্দ্রতা প্রতিবন্ধক হিসাবে জিওটেক্সটাইলের উপকারীতা অতুলনীয়।

৬। জিও-টেক্সটাইল ড্রেইনেজ এ ভূমিকা রাখে , এজন্যে খেলার মাঠে ব্যাবহার হয়।

 
 

জিও টেক্সটাইল শীট ও ব্যাগ কথায় পাবেন ?

এটি দুই ধরনের হয়ে থাকে.

PP: polypropylene staple fiber.
PSF: polyester staple fiber Sheet. Roll. Bag.Tube.
 

পিপি = ১০ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়।

পি,এস,এফ= ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়।

Pp = 10-50 years

PSF = 5 to 10 years

100% PP and PSF
 
জিও টেক্সটাইল জি,আস,এম (GSM) এর উপর ভিত্তি করে দাম নির্ধারণ করে থাকে। নিচে জি,এস,এম (GSM) এর লিস্ট দেওয়া হল।

1) 150gsm

2) 180gsm

3) 200gsm

4) 250gsm

5) 300gsm

6) 350gsm

7) 400gsm

8) 450gsm

9) 500gsm

10) 550gsm

11) 600gsm

 

জিও টেক্সটাইল শীট রুল হিসাবে বিক্রি হয়। প্রতি রুলে লম্বায় ১০০ মিটার থাকে।এবং প্রস্থে – ৩,৪,৫ মিটার পাওয়া যায়

 জিও টেক্সটাইল ব্যাগ পিছ হিসাবে বিক্রি হয়।

ব্যাগ গুলো বিভিন্ন মাপের হয়ে থাকে

ব্যাগ গুলো মাপ মিটার,ফিট ও কেজিতে নির্ণয় করা হয়

 
 

'নরম মাটিতে জিও টেক্সটাইল মোড়ানো বাঁধ ভূমিকম্প-প্রতিরোধী'
 

নরম মাটিতে জিও টেক্সটাইল মোড়ানো খাড়া বাঁধ ভূমিকম্প প্রতিরোধী এবং টেকশই। ভূমিকম্প অথবা ওয়েভের (সাইনসয়ডাল) সময় বাঁধের বিভিন্ন স্তরের গতিশীল গুণাবলী কি রকম পরিবর্তন হয় সেটা বিবেচনায় নিয়ে বাঁধ ডিজাইন করলে, বাঁধটি ভূমিকম্প প্রতিরোধী ও টেকশই হবে।

মঙ্গলবার বিকেলে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি)-এর পুরকৌশল বিভাগ আয়োজিত 'বাংলাদেশের নরম মাটিতে ভূমিকম্প প্রতিরোধী মোড়ানো বাঁধের প্রয়োগ' র্শীষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।


আইইবি পুরকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ইঞ্জিনিয়ার মুনাজ আহমেদ নূরের সভাপতিত্বে এবং বিভাগের সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার অমিত কুমার চক্রবর্তীর সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এবং আইইবির সাবেক প্রেসডেন্ট আবদুস সবুর। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইইবির প্রেসিডেন্ট নূরুল হুদা, আইইবি'র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. নূরুজ্জামান এবং এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রশীদ খান। স্বাগত বক্তব্য দেন আইইবি'র সম্মানী সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার শাহাদাৎ হোসেন (শীবলু)।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এলজিইডির প্রকৌশলী ড. ইঞ্জিনিয়ার রিপন হোড়। মূল প্রবন্ধের উপর আলোচনা করেন বুয়েটের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী। অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন আইইবির ভাইস-চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার জিকরুল হাসান।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, মোড়ানো বাঁধটি বিভিন্ন জিওটপেটাইল দ্বারা প্যাচানো থাকে এবং বিভিন্ন বৈশিষ্টের বালু-সিমেন্ট দ্বারা পূর্ণ করা হয়। বাঁধটি খাড়া হবার কারণে প্রচলিত বাঁধের তুলনায় দুই পাশের কৃষিজমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হয় না। বাঁধটি তৈরির সময় দুই ধরনের ওভেন অথবা নন ওভেন জিওটেক্সটাইল ব্যবহার করা হয়। ফলে বাঁধটি অনেকটাই ভূমিকম্পপ্রতিরোধী হয়।


✅  বাংলাদেশের জিওটেক্সটাইল খাতে নতুন বিনিয়োগে বড় লাভের সম্ভাবনা

নদীর পাড় রক্ষা কিংবা নদীভাঙ্গন ঠেকাতে নতুন নতুন প্রকল্প এবং সড়ক-মহাসড়কের মত অবকাঠামো উন্নয়ন কাজে সরকারের ব্যয় বাড়ায় জিও টেক্সটাইল পণ্যের চাহিদাও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা 

দেশে জিও টেক্সটাইলের বাজার বড় হওয়ার আশায় এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে। বর্তমানে সাতটি প্রতিষ্ঠান জিও টেক্সটাইল পণ্য উৎপাদন করলেও নতুন করে বিনিয়োগে এসেছে আরো দুটি প্রতিষ্ঠান। নদীর পাড় রক্ষা কিংবা নদীভাঙ্গন ঠেকাতে নতুন নতুন প্রকল্প এবং সড়ক-মহাসড়কের মত অবকাঠামো উন্নয়ন কাজে সরকারের ব্যয় বাড়ায় জিও টেক্সটাইল পণ্যের চাহিদাও বাড়ছে। এ চাহিদা ক্রমাগত বাড়ার আশায় নতুন বিনিয়োগ আসছে বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। 

এ খাতে নতুন করে বিনিয়োগ নিয়ে এসেছে কনফিডেন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড এবং ওয়েস্টার্ন সুপিরিওর জুট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। এর মধ্যে ওয়েস্টার্ন সুপিরিওর জুট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড স্বল্প পরিসরে উৎপাদন শুরু করেছে। আর কনফিডেন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ২০২২ সালের মার্চ নাগাদ উৎপাদনে যাবে বলে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি এ লক্ষ্যে জার্মানি ভিত্তিক আউটিফা সলিউশন্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অত্যাধুনিক দুটি মেশিন ক্রয় করছে, যা আগামী মাসে জাহাজীকরণ হওয়ার কথা। প্রতিষ্ঠানটি ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।   
কনফিডেন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড এর প্রধান পরিচালনা কর্মকর্তা (সিওও) শহিদুল ইসলাম টিবিএস'কে বলেন, "২০২২ সালের প্রথম প্রান্তিকে উৎপাদনে যাওয়ার পর আমাদের কারখানায় দৈনিক ৭০-৮০ টন জিওটেক্সটাইলস উৎপন্ন হবে। কারখানায় ৫০০ জনের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে।" 

তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে দুটি নন-উভেন নিডল পাঞ্চিং জিও-টেক্সটাইল ম্যানুফ্যাকচারিং প্রোডাকশন লাইন দিয়ে শুরু করলেও ভবিষ্যতে এ বিনিয়োগ দ্বিগুণ করার লক্ষ্য রয়েছে। এজন্য জার্মানি থেকে কেনা দুটি অত্যাধুনিক মেশিন লাইন আগামী মাসেই পাঠানো হবে বলে জানান শহিদুল। 

এদিকে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার পাইপলাইনে অনেক অবকাঠামো প্রকল্প থাকায় জিওটেক্সটাইলের চাহিদা দিন দিন বাড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সামনে এ পণ্য রপ্তানির সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে। 

ওয়েস্টার্ন সুপিরিওর জুট ইন্ডাস্ট্রিজের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক ইঞ্জিনিয়ার আবু হাসনাত বলেন, "আমরা এখন প্রতিদিন ছয় টন জিওটেক্সটাইল উৎপাদন করছি। উৎপাদন বাড়াতে নতুন মেশিন লাইন বসানোর কাজও চলছে। বর্তমানে আমাদের মোট বিনিয়োগ প্রায় ৩০ কোটি টাকা।" 

জিও টেক্সটাইল মূলত নন-উভেন টেক্সটাইল- যা দিয়ে উৎপাদিত জিওব্যাগ, জিওশিট ও জিওইউব দিয়ে নদীরক্ষা বাঁধ, সড়ক অবকাঠামো তৈরি, মেরামত, পাকাকরণসহ যে কোন ধরনের বাঁধ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে বহুলভাবে ব্যবহার হয় জিওব্যাগ, যা বড় বড় প্রকল্পের কাজে ব্যবহার হয়ে থাকে। 

বিভিন্ন সূত্রমতে, কেবল পদ্মা সেতুর নদী শাসন কাজেই ব্যবহার হয়েছে এক কোটি ৪৭ লাখ জিওব্যাগ ও ৬৮ হাজার জিও টিউব।

এর মূল কাঁচামাল পলি প্রপিলিন ফাইবার বা পিপি ফাইবার ফেব্রিক থেকে তৈরি হয়। ওই ফেব্রিক দিয়ে তৈরি ব্যাগে মাটি বা বালি ভর্তি করে তা দিয়ে বাঁধ নির্মাণসহ অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ করা হয়। এই কাঁচামাল আমদানিনির্ভর। মূলত চীন, ভিয়েতনাম ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ থেকে এসব কাঁচামাল আমদানি করতে হয়।  

দেশে জিও টেক্সটাইল খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের টার্নওভারের তথ্যও প্রকাশ করতে চায় না। 

তবে খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের পরিমাণ কেমন হবে, তা নির্ভর করছে ওই প্রতিষ্ঠান কেমন মানের মেশিন ব্যবহার করছে, যেমন- নতুন মেশিন না রিকন্ডিশন্ড মেশিন তার ওপর। যেমন একটি রিকন্ডিশন্ড মেশিন দিয়েও উৎপাদন শুরু করা যায়, সেক্ষেত্রে একটি প্রতিষ্ঠানের হয়তো মোট বিনিয়োগের পরিমাণ হতে পারে ৮-১০ কোটি টাকা। 

অন্যদিকে, দেশের সবচেয়ে বড় জিওটেক্সটাইল প্রস্তুতকারক বিজে জিও -টেক্সটাইল লিমিটেড ও ডার্ড ফেল্ট লিমিটেড অন্তত ছয়টি মেশিন লাইন দিয়ে তাদের উৎপাদন কাজ চালাচ্ছে। 

এখাতে অন্তত ৭০০ কোটি টাকা এপর্যন্ত বিনিয়োগ হয়েছে বলে জানায় প্রতিষ্ঠান দুটি। 

আর জিও টেক্সটাইলের বার্ষিক চাহিদা ১ হাজার থেকে ১২০০ কোটি টাকার। ১৯৯৫ সাল থেকে দেশে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজে জিওব্যাগের ব্যবহার শুরু হলেও, পূর্বে ওই চাহিদা মেটানো হতো মূলত মালয়েশিয়া থেকে আমদানির মাধ্যমে। তবে দেশে চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধির সাথে সাথে নন-উভেন জিওটেক্সটাইলের দেশীয় উৎপাদন শুরু হওয়ার পর আমদানির উপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। 

বর্তমানে স্থানীয় চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশের বেশি দেশের সাতটি কোম্পানির উৎপাদিত জিও টেক্সটাইল পণ্যের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে।

আর রেলসহ কিছু কিছু প্রকল্পের কাজে উভেন জিও টেক্সটাইল ব্যবহার হয়, যা দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন করে না। এ ধরনের  জিও টেক্সটাইল আমদানি করতে হয়, যা মোট ব্যবহারের দুই শতাংশের বেশি হবে না বলে অনুমান করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। 

সূত্র জানায়, দেশে প্রথম জিও টেক্সটাইলের বিপণন শুরু করেছিলো ডার্ড গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির আওতাধীন জিও টেক্সটাইলের আলাদা কোম্পানির নাম ডার্ড ফেল্ট লিমিটেড, যেখানে প্রায় এক হাজার জনের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৭৫ টন।  

ডার্ড ফেল্ট এর নির্বাহী পরিচালক সৌমিত্র মুৎসুদ্দি টিবিএস'কে বলেন, বাংলাদেশে প্রথম জিও টেক্সটাইলের ব্যবসা শুরু করেছে এ প্রতিষ্ঠান এবং এপর্যন্ত দেশে অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান এটি। পদ্মা সেতু প্রকল্পের নদী শাসন কাজে ব্যবহার হওয়া বিপুল পরিমাণ জিও ব্যাগ ও জিওটিউবের অর্ধেকই সরবরাহ করেছে। 

'পৃথিবীর সব দেশেই নদী রক্ষা, রিভার ট্রেনিং, বাঁধ নির্মাণ, অবকাঠামো উন্নয়ন কাজে জিওটেক্সটাইলের বহুল ব্যবহার রয়েছে। এর উপকারিতার কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশেও আলোচ্য কাজে জিও টেক্সটাইলের ব্যবহার বাড়বে বলে আশা করছি। ফলে দেশে এর বাজারও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে,' বলেন তিনি। 

ডার্ড গ্রুপ এর বার্ষিক টার্নওভার সম্পর্কে তিনি পরিস্কার তথ্য দিতে না পারলেও অপর একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, গত বছর প্রতিষ্ঠানটির টার্নওভার ছিলো ২০০ কোটি টাকার উপরে। আর ২০১৫ সালে তা ছিলো ৩২০ কোটি টাকা। 

অবশ্য এ খাতের বাজারের আকার কিংবা ভবিষ্যত সম্ভাবনা নিয়ে বিপরীতমুখী বক্তব্যও রয়েছে। নাহি জিও টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের একজন ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, বর্তমানে জিও টেক্সটাইলের যে বাজারের আকার, তা গত কয়েক বছর ধরে প্রায় একই অবস্থানে রয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে চাহিদা বরং কিছুটা কমেছে। বর্তমানে চাহিদার তুলনায় ক্যাপাসিটি বেশি রয়েছে। এ কারণে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে সাতটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিনটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। 

'এ পরিস্থিতিতে নতুন করে যারা বিনিয়োগ নিয়ে আসছেন, তাদের এই অংশের মধ্যেই ভাগ বসাতে হবে, ফলে কাউকে না কাউকে হয়তো ঝরে যেতে হবে' - বলেন তিনি। 

অবশ্য এমন বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন নতুন বিনিয়োগে আসা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। তারা জানান, বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ এবং প্রতি বছরই নদী খনন, নদী পাড়ে বাঁধ নির্মাণ, ড্রেজিং ও নদী শাসনের মত কাজ কমবে না বরং বাড়বে। অন্যদিকে সড়কসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অবকাঠামোর কাজে স্থায়িত্ব বাড়ানোর জন্য দিনে দিনে জিও টেক্সটাইলের ব্যবহার বাড়বে। 

দেশে জিও টেক্সটাইল উৎপাদনকারী হিসেবে শীর্ষে রয়েছে বিজে জিও- টেক্সটাইল লিমিটেড- এর নাম। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশে এ প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ক্ষমতা এখন সবচেয়ে বেশি। এছাড়া তাদের কারখানায় রয়েছে জিও টেক্সটাইল ব্যাগ উৎপাদনের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি।   

এর বাইরেও রাহাত জিও-টেক্সটাইল অ্যান্ড সিনথেটিক লিমিটেড, এফজি জিওটেক্সটাইল, অর্কিড জিওটেক্সটাইল ও আরএম জিওটেক্স লিমিটেড বর্তমানে পণ্য উৎপাদন করে বলে জানা গেছে।



বড় ভূমিকম্পেও ভাঙবে না বাঁধ, নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন ( জিও টেক্সটাইল )

বর্তমান বিশ্বে বড় আতঙ্কের নাম ভূমিকম্প। বাংলাদেশও এ আতঙ্কের বাইরে নয়। ভূতাত্ত্বিক ও ভূমির গঠন অনুসারে বাংলাদেশ ভূকম্পনপ্রবণ অঞ্চল। বিগত ২০০ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশে আটটি বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়েছে। এর মধ্যে ১৮৬৯ সালে সিলেট অঞ্চলে রিখটার স্কেলে সর্বোচ্চ ৭.৬ মাত্রার কম্পন অনুভূত হয়। একই স্থানে গত ৩০ মে সকাল থেকে অন্তত পাঁচবার কম্পন হয়। ৭ জুন সন্ধ্যা ৬টা ২৯ ও ৬টা ৩০ মিনিটে আবারও দুই দফা ভূকম্পন হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত বড় কোনো ভূমিকম্পের আগে বা পরে এমন দফায় দফায় মৃদু কম্পন হতে পারে।

বাংলাদেশে যদি বড় ধরনের ভূমিকম্প হয় তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিভিন্ন স্থাপনা ও সড়ক-মহাসড়কগুলো। যদিও আধুনিক যুগে সুউচ্চ ভবন কিংবা স্থাপত্য নির্মাণে ভূমিকম্প সহনশীল প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু দেশের সড়ক ও মহাসড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে ভূমিকম্পের বিষয়টি এখনও অবহেলিত।

এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশে ভূমিকম্প সহনশীল সড়ক বা মহাসড়ক নির্মাণে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারি এবং তার ছাত্র প্রকৌশলী রিপন হোড়ের সমন্বয়ে গঠিত গবেষক দল। ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় বছরের গবেষণায় উদ্ভাবিত ‘র‌্যাপ ফেস ইমব্যাংকমেন্ট (wrape face embankment)’ নামের নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে বাঁধ, সড়ক-মহাসড়ক কিংবা রেললাইন বড় মাত্রার ভূমিকম্পেও অক্ষত থাকবে। পাশাপাশি চলমান পদ্ধতিতে নির্মাণের তুলনায় আর্থিক ব্যয় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমে আসবে। সবচেয়ে আশার কথা হলো, এ প্রযুক্তি অনেক কৃষিজমি বাঁচিয়ে দেবে। মূলত, আমাদের দেশে নতুন সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণে দুই পাশের ব্যাপক কৃষিজমি নষ্ট হয়। ‘র‌্যাপ ফেস ইমব্যাংকমেন্ট’ প্রযুক্তি ব্যবহারে উঁচু বাঁধ বা রাস্তা নির্মাণে দুই পাশের জমির ব্যবহার অনেক কমে যাবে।

ইতোমধ্যে জাপান ও আমেরিকার শক্ত মাটিতে এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহারে সফলতা মিলেছে। তবে বাংলাদেশের মতো নরম মাটির দেশে এ প্রযুক্তি কার্যকর কি না, তা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন বিশেষজ্ঞরা। তবে রিপন-আনসারি উদ্ভাবিত প্রযুক্তি নরম মাটিতেও বেশ কার্যকর। ইতোমধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় তা প্রমাণিত হয়েছে।

শুধু তা-ই নয়, তাদের গবেষণার ফলাফলকে তিনটি বিখ্যাত আন্তর্জাতিক জার্নালও স্বীকৃতি দিয়েছে। সেখানে তাদের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। জার্নালগুলো হলো- জিওটেকনিক্যাল অ্যান্ড জিওলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব জিওসিন্থেটিকস অ্যান্ড গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ও ট্রান্সপোর্টেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার জিওটেকনোলজি।


র‌্যাপ ফেস ইমব্যাংকমেন্ট (Wrap face embankment) কী?
 
র‌্যাপ ফেস ইমব্যাংকমেন্ট বা মোড়ানো বাঁধ হলো জিও টেক্সটাইল দিয়ে মোড়ানো খাড়া বাঁধ। মোড়ানো বাঁধটি বিভিন্ন জিও টেক্সটাইল দিয়ে প্যাঁচানো থাকে এবং বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের বালু দ্বারা পূর্ণ থাকে। বাঁধটি খাড়া হবার কারণে প্রচলিত বাঁধের তুলনায় দুপাশের কৃষিজমি অধিগ্রহণ করার প্রয়োজন হয় না। বাঁধটি বানানোর সময় দুই ধরনের যথা ওভেন অথবা ননওভেন জিওটেক্সটাইল ব্যবহার করা হয়। মোড়ানো বাঁধটি মাটির গুণাবলির পারস্পারিক অবস্থা ও ইজিএল’র ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন লেয়ারের হয়ে থাকে।
 
সার্বিক বিষয়ে কথা হয় গবেষক দলের প্রধান ও বুয়েট অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারির সঙ্গে । ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, যদিও আমাদের গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল অধিক মাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল বাঁধ বা সড়ক নির্মাণ করা। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় আশার কথা হচ্ছে, এ প্রযুক্তি ব্যবহারে ব্যাপক হারে কৃষিজমি রক্ষা পাবে। সরকারকেও ভূমি অধিগ্রহণের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হবে না। যেমন- ১০ মিটার উঁচু ও ১০ মিটার প্রশস্ত একটি বাঁধ নির্মাণে দুই পাশে দিগুণ ঢাল তৈরি করতে হয়। একপাশে ২০ মিটার ও অন্যপাশে ২০ মিটার জমির প্রয়োজন হয়। সবমিলিয়ে ৫০ মিটার। অর্থাৎ সড়ক কিংবা বাঁধ নির্মাণে পাঁচগুণ জায়গা নষ্ট হয়। কিন্তু এ প্রযুক্তিতে কোনো ঢাল নির্মাণ করতে হয় না। সরাসরি উঁচু সড়ক হয়, তাই দুই পাশের জমি বেঁচে যায়।


বুয়েট অধ্যাপক আরও বলেন, বন্যায় সাধারণ বাঁধ ভেঙে যায় বা ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু এ প্রযুক্তিতে তৈরি করা বাঁধ নির্মাণে জিও টেক্সটাইল ও বালুর সমন্বয়ে বেশ মজবুত কাঠামো ব্যবহার করা হয়। তাই বন্যায়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। এছাড়া বর্তমানে জিও টেক্সটাইল বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। তাই এটি সহজলভ্য বলা যায়।

জিও টেক্সটাইল কী

জিও টেক্সটাইল প্রোডাক্ট মূলত পলিস্টার, পলিপ্রপিলিন, পলিঅ্যামাইড দিয়ে তৈরি হয়। জিও টেক’র সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় সিভিল/কনস্ট্রাকশন কাজে। এতে মাটির বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে দুর্বল ও অকার্যকর জায়গায় ভবন নির্মাণের উপযোগী করে তোলা হয়। আধুনিক সিভিল/কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং-এ বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে এ জিও টেক্সটাইল। জিও টেক্সটাইল সাধারণত মাটির বৈশিষ্ট্য উন্নয়নে যেমন- কোনো রাস্তা, বাঁধ, পাইপলাইন এবং মাটিতে বৃহৎ কোনো কাঠামো তৈরিতে ব্যবহার হয়।    

বড় ধরনের ভূমিকম্পে আপনাদের এ প্রযুক্তি কতখানি কার্যকর— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভূমিকম্পের ফলে যে ঝাঁকুনি হয় তাকে আমরা তীব্রতা বা ইনটেনসিটি বলি। এ প্রযুক্তিতে নির্মাণ করা বাঁধ বা সড়ক ৭ থেকে ৮ তীব্রতার (ইনটেনসিটি) ভূমিকম্পেও অক্ষত থাকবে। সাধারণত যেকোনো মাত্রার ভূমিকম্পে সর্বোচ্চ তীব্রতা ধরা হয় ১২। সেখানে আমাদের গবেষণায় নির্মিত বাঁধ সর্বোচ্চ ৮ তীব্রতার ঝাঁকুনি নিতে সক্ষম। আমাদের ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম ঝাঁকুনি দিয়ে এর প্রমাণ পাওয়া গেছে।

অধ্যাপক আনসারি আরও বলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকায় নরম মাটির আধিক্য রয়েছে। আমাদের গবেষণায়ও নরম মাটি ব্যবহার করেছি। সেখানে আমরা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি যে, নরম মাটিতে র‌্যাপ ফেস ইমব্যাংকমেন্ট প্রযুক্তি বেশ কার্যকর। ফলে নরম মাটির ওপর বাঁধ কিংবা রেললাইন নির্মাণে শক্ত ভিত তৈরিতে সরকারকে যে ব্যয় করতে হয়, ওটার আর প্রয়োজন হবে না। অর্থাৎ নরম মাটিতেও এ প্রযুক্তি বেশ কার্যকর বলতে পারি। যেমন- বর্তমানে পদ্মা সেতু প্রকল্পে রেললাইন স্থাপনে অধিকাংশ জায়গায় নরম মাটির কারণে প্রচুর টাকা খরচ করতে হচ্ছে সরকারকে। কারণ, নরম মাটিতে ভিত মজবুত করে তারপর স্থাপনা নির্মাণ করতে হয়। পায়রা বন্দরেও স্থাপনা নির্মাণে আমরা একই অবস্থা দেখেছি। এ প্রযুক্তি আমাদের বড় অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় করবে।

ব্যয়ের বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চাইলে অপর গবেষক প্রকৌশলী রিপন হোড় ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমাদের দেশে অর্ধ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণে চার কোটি তিন লাখ টাকার মতো অর্থ খরচ হয়। সেখানে র‌্যাপ ফেস ইমব্যাংকমেন্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করলে খরচ হবে এক কোটি ৮৬ লাখ টাকার মতো। অর্থাৎ খরচ ৭০ শতাংশ কমে যাচ্ছে।’

রিপন হোড় বর্তমানে এলজিইডি’র প্রধান কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত আছেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে ২০২০ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।

রিপন আরও বলেন, “আমার গবেষণার মূল বিষয় ছিল বাংলাদেশের নরম মাটিতে ‘র‌্যাপ ফেস ইমব্যাংকমেন্ট’ ভূমিকম্পে কেমন আচরণ করবে, তার বিশ্লেষণ করা। আমার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারি। ভূমিকম্পের সময় অবকাঠামোর নিচের মাটি কীভাবে আচরণ করবে যা নির্ণয় খুবই চ্যালেঞ্জিং ছিল। এটা আমার গবেষণার বড় প্রাপ্তি। ভূমিকম্পের সময় অবকাঠামোর নিচের মাটির আচরণ আমার গবেষণায় উঠে এসেছে। এটা করার জন্য সেক টেবিল টেস্ট মেশিন ও সংখ্যাগত বিষয় যাচাই করতে প্লাসিক্স থ্রিডি অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের উদ্ভাবিত এ প্রযুক্তি যদি ব্যবহার করা যায় তাহলে তিনটা উদ্দেশ্য অর্জিত হবে। প্রথমত, সাধারণ নিয়মে রাস্তা নির্মাণে বড় পরিসরে জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে সরকারের আর্থিক ব্যয় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমে যাবে। দ্বিতীয়ত, সারাদেশে রাস্তা নির্মাণের জন্য ব্যাপক কৃষি জমি নষ্ট হয়। এটা থেকে আমাদের মুক্তি মিলবে এবং সর্বশেষ, বাঁধটি ভূমিকম্প সহনশীল হবে। বাংলাদেশ সরকারের তিনটি সংস্থা- এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ এবং বাংলাদেশ রেলওয়ে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে।

জিও টেক্সটাইল কি এবং জিও টেক্সটাইলের ব্যাবহার | Geo Textile