“আদিম গুহামানব থেকে আজকের আধুনিক মানুষ” এই বিশাল রূপান্তরের ফলে যেমন মানুষের দৈহিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে তেমনি পরিবর্তন ঘটেছে পোশাক-আশাকের ক্ষেত্রে। আজকের আধুনিক পৃথিবীতে বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ হচ্ছে “ফ্যাশন”। সহজ শব্দে বলা হয়ে থাকে মানুষের নান্দনিকতার বহিঃপ্রকাশই হচ্ছে ফ্যাশন। ফ্যাশন দুনিয়ায় অন্যতম পরিচিত একটি নাম হচ্ছে “হাউস অফ শ্যানেল”।
১৮৮৩ সালে ফ্রান্সের সোম্যুর শহরে দরিদ্র এক পরিবারে জন্ম “গ্যাব্রিয়েল বনহ্যুর শ্যানেল”-এর। মা এর মৃত্যু এবং বাবার প্রত্যাখানের পর অনাথ আশ্রমেই বেড়ে ওঠা ফলে ফ্যাশন জগতের সাথে কোনো ধরনের সর্ম্পকই তার ছিলো না। কিন্তু এই গ্যাব্রিয়েল শ্যানেলই একসময় হয়ে ওঠেন ফ্যাশন জগতের কিংবদন্তী।
নাইট ক্লাবের নিয়মিত একজন গায়িকা থেকে তিনি হয়ে ওঠেন ফ্যাশন জগতের অন্যতম আইকন। ১৯০৯ সালে তার হাত ধরেই শুরু হয় হাউস অফ শ্যানেলের পথচলা এবং ১৯২০ সালের মধ্যেই শ্যানেল ইন্ডাস্ট্রিজের মূলধন পৌছায় কয়েক মিলিয়নে। পরবর্তীতে শ্যানেলের হাত ধরেই এসেছে ফ্যাশন জগতের অন্যতম ক্ল্যাসিক পোশাক ও অন্যান্য প্রসাধনী সামগ্রী। ট্যুইড জ্যাকেট ও লিটল ব্ল্যাক ড্রেস (LBD) আজও ফ্যাশন জগতের অন্যতম সংযোজন এবং বিশ্বদরবারে বহুল সমাদৃত। পরবর্তীতে আরও এক ধাপ এগিয়ে হাউস অফ শ্যানেল তৈরি করে তাদের সিগনেচার পারফিউম N°5 যা কিনা অড্রে হেপবার্ন এবং মেরলিন মনরো এর মতো শীর্ষ তারকাদের পছন্দের তালিকায় ছিলো এবং যা আজও বিশ্বের বেস্টসেলার পারফিউমের তালিকায় সদর্পনে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।
১৯০০ শতাব্দী এর মেয়েদের ফ্যাশন জগতের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটে যখন হাউস অফ শ্যানেল মেয়েদের জন্য কলারবিহীন স্যুট ও স্কার্টের প্রচলন করে যা একটি ফ্যাশন স্টেটমেন্টে পরিণত হয়। প্যারিস ফ্যাশন উইকে এখনও দাপটের সাথে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে হাউস অফ শ্যানেল। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৩১০টি শ্যানেল বুটিক রয়েছে যার মধ্যে ৯৪টি এশিয়ায়, ৭০টি ইউরোপে, ১২৮টি উত্তর আমেরিকায় এবং আরো অন্যান্য দেশে কিছু সংখ্যক বুটিক রয়েছে। ২০১৮ সালের জরিপ অনুযায়ী, শ্যানেল-এর মোট আয়ের পরিমাণ প্রায় ১১বিলিয়ন ডলার।
ফ্যাশন জগতে শ্যানেল যেমনি প্রভাব ফেলেছে তেমনি জন্ম দিয়েছে বির্তকেরও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গ্যাব্রিয়েল শ্যানেলের ওপর অভিযোগ আসে গুপ্তচরবৃত্তির। অভিযোগ করা হয় তিনি নাজি সৈন্যবাহিনীর পক্ষে গুপ্তচর হিসেবে কাজ করছেন। ফলশ্রুতিতে তাকে নির্বাসিত হয়ে চলে যেতে হয় সুইজারল্যান্ডে এবং সেই সাথে থমকে যায় শ্যানেলের পথচলা। তবে ১৯৫৩ সালে আরো শক্তিশালী হয়ে ফ্যাশন জগতে ফিরে আসে শ্যানেল এবং মেয়েদের পোশাকের পাশাপাশি তারা গহনা, হ্যান্ডব্যাগ তৈরি করা শুরু করে।
১৯৭১ সালে কোকো শ্যানেলের মৃত্যুর পর বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে ১৯৮৩ সালে কার্ল লেগারফ্যাল্ড হাউস অফ শ্যানেলের দায়িত্ব নেন। তিনি কোকো শ্যানেলের সিগনেচার দিকসমুহ ঠিক রেখে নতুনত্ব আনেন এবং নতুন ধরনের ফ্যাব্রিক্সের ব্যবহার শুরু করেন। মেয়েলি পোশাকের চিরায়ত ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে তিনি সম্পূর্ণ নতুন ধরনের পোশাকের প্রবর্তন করেন। ১৯৯৪ সালে শ্যানেলকে সর্বাধিক উপার্জিত ফ্যাশন হাউসের উপাধি দেওয়া হয়। ২০০৩ সালে শ্যানেল তাদের আলোচিত কালেকশন “কোকো মেদেমস্যয়েলে” বাজারে আনেন এবং টোকিও-তে তাদের সবচেয়ে বড় ফ্যাশন বুটিকের উন্মোচন করে। ২০১৮ সালে শ্যানেলের হেডকোয়ার্টার লন্ডনে স্থানান্তরিত করা হয় এবং তারা ঘোষণা দেয় যে পরর্বতী থেকে তারা প্রাণীর লোম, পশম ইত্যাদি ব্যবহার থেকে বিরত থাকবেন।
২০১৯ সালে কার্ল লেগারফ্যাল্ড মৃত্যুবরণ করেন এবং ফ্যাশন জগতে নেমে আসে শোকের ছায়া। এরপরও থেমে নেই হাউস অফ শ্যানেলের পথচলা। যুগে যুগে হাউস অফ শ্যানেলের হাত ধরে পরিবর্তীত হচ্ছে ফ্যাশনের সংজ্ঞা। এগিয়ে চলেছে হাউস অফ শ্যানেলের পথচলা।
“A girl should be two things – Classy & Fabulous” --- COCO Chanel
Tags:
Fashion Brand







