ভারসাচি | VERSACE | Fashion Brand

মিথোলোজি অথবা পুরাণ গল্প এইযুগে মোটামুটি সবারই পছন্দের তালিকায় রয়েছে। মিথোলোজিতে সবচেয়ে জনপ্রিয় শাখা হচ্ছে "গ্রীক মিথোলোজি"। চমৎকার সব কাহিনী, রূপকথা ও দেব-দেবীর উপাখ্যান নিয়ে যুগ যুগ ধরে সমাদৃত হয়ে এসেছে গ্রীক মিথোলোজি। এতে যেমন রয়েছে দেব-দেবীর রূপকথা তেমনি রয়েছে ভয়ংকর সব দানব-দানবীর কল্পকাহিনী। জিউস- পসাইডনের পাশাপাশি গ্রীক মিথোলোজিতে বেশ প্রভাব রয়েছে গর্গন বোনদের। তারা যে-সে কোনো বোন নয়, গ্রীকপুরাণে বর্ণিত ভয়ংকর তিন রাক্ষসী। এদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর ও শক্তিশালী ছিল "মেডুসা"। সে ছিলো এক ভয়ংকর দানবী, যার মুখমন্ডল ছিলো নারীর কিন্তু তার মাথায় চুলের পরিবর্তে ছিলো জীবন্ত-সাপ। কোনো ব্যক্তি সরাসরি মেডুসার চোখের দিকে তাকালে সে পাথরে পরিণত হয়ে যেতো। এখন এই পৌরাণিক চরিত্র মেডুসার সাথে আমরা কি কোনোভাবে ফ্যাশনকে যুক্ত করতে পারি..? আমরা না পারলেও আজ থেকে বহু বছর আগে ইতালির একজন তরুন ফ্যাশন ডিজাইনার এই কল্পনা করতে পেরেছিলো।



১৯৭৮ সালে "জিয়ান্নি ভারসাচি" একটি নতুন ফ্যাশন লেভেল তৈরি করেন এবং তাদের বংশের পদবী "ভারসাচি"-এর অনুসারে ব্র‍্যান্ডটির নামকরন করেন। "জিয়ান্নি ভারসাচি" তারঁ স্বপ্নের ব্র‍্যান্ডটির লোগো হিসেবে ব্যবহার করেন "মেডুসা" কে। যদিও ফ্যাশন ও মেডুসা সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস তবুও তিনি মেডুসাকে লোগো হিসেবে ব্যবহার করেন কারণ মেডুসা যেমন তার শিকারকে প্রথমে আকৃষ্ট করে এবং পরবর্তীতে থাকে পাথরে পরিণত করে তেমনিভাবে "জিয়ান্নি ভারসাচি"- ও চেয়েছিলেন ক্রেতাদের তার তৈরি পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট করতে। ১৯৭২ সালে "জিয়ান্নি ভারসাচি" তার সর্বপ্রথম কালেকশন নিয়ে সকলের সামনে আসেন এবং সাথে সাথেই সকলের নজর কারেন। সম্পূর্ণ আলাদা ধরণের প্যাটার্ন- প্রিন্ট ও উজ্জ্বল রঙ ব্যবহার করে সকলের মনোযোগ আকর্ষণে তিনি সক্ষম হন। ১৯৭০-৮০ এর দশকে যখন সকল ফ্যাশন ব্র‍্যান্ড খুবই সাবধানতার সাথে পদক্ষেপ ফেলছিলো তখন "জিয়ান্নি ভারসাচি"- এর এ পদক্ষেপ ছিলো বেশ বিপদজনক। ক্রেতাদেরকে সেফজোন থেকে বের করে আনার এক অভিনব ব্যাপার ঘটিয়ে ফেলেন জিয়ান্নি। "জিয়ান্নি ভারসাচি"কে বলা হতো "রক এন রোল ডিজাইনার"। বাহারি ডিজাইনে "এল্টন জন" ও "মাইকেল জ্যাকসন" দের মতো তারকাদের দৃষ্টি তিনি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। ধীরে ধীরে তারকাদের এ তালিকায় যুক্ত হয় "প্রিন্সেস অফ ওয়েলস"-এর মতো নামও।


খুব অল্প সময়েই "জিয়ান্নি ভারসাচি" পৌছে যান সাফল্যের চূড়ায়। সেই সাথে "নাওমি ক্যাম্পবেল"- এর মতো কৃষ্ণবর্ণের মডেলদের ফ্যাশন জগতে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। "জিয়ান্নি ভারসাচি" তখনকার সময়ের একমাত্র ব্যক্তি যে কিনা ফ্যাশন কোম্পানির ডিজাইনার পদ থেকে শুরু করে পরিচালক এর মতো গুরুত্ত্বপূর্ণ পদগুলোতে বহাল ছিলেন অর্থাৎ কোম্পানির সকল ব্যাপার ছিলো তারঁ নখদর্পণে। জিয়ান্নি ভারসাচি এর পাশাপাশি তারঁ বোন "ডোনাতেলা ভারসাচি" কম বয়স্ক ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখে আরেকটি ফ্যাশন লেভেল তৈরি করেন। পোশাকের পাশাপাশি তারা আনুসাঙ্গিক দিকগুলোতেও এবার গুরুত্ব প্রদান করেন। স্কার্ফ, হেয়ার ক্লিপ থেকে শুরু করে পারফিউম ও বাজারজাত করতে শুরু করেন। তরুণ ভাই- বোনের ফ্যাশন জগতের পথচলা খুব সুন্দর গতিতেই এগিয়ে চলছিল কিন্তু ১৯৯৭ সালের ১৫ জুলাই ফ্যাশন জগতে নেমে আসে শোকের ছায়া। মায়ামিতে মর্নিং ওয়াকে বের হয়ে নিজের বাড়ির সামনে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন "জিয়ান্নি ভারসাচি"। সেই সাথে জন্ম দিয়ে যান নতুন অনেক বিতর্কের। কেউ কেউ বলে থাকেন সান ফ্রান্সিকোতে অনৈতিক কাজের সাথে জড়িয়ে নিহত হতে হয় "জিয়ান্নি ভারসাচি"- কে। তবে আজো তার হত্যার মূল কারণ জানা যায় নি। তবে "জিয়ান্নি ভারসাচি"- এর মৃত্যুর পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় "ভারসাচি" ব্র‍্যান্ডকে। 


তখন "ভারসাচি"- এর দায়িত্ব নিতে হয় "ডোনাতেলা ভারসাচি"- কে। তাকে ফ্যাশন দুনিয়ায় তাল মেলানোর পাশাপাশি নিজ জীবনকেও সামলাতে হয়। প্রচুর পরিমাণ মাদকদ্রব্য সেবনের জন্য প্রায়ই সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছে ডোনাতেলাকে। এতো কিছুর পরও একজন ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে "ডোনাতেলা ভারসাচি" সফল একজন নারী। ২০০০ সালে অনুষ্ঠিত ৪২তম গ্র‍্যামি অ্যাওয়ার্ড শো'তে "ডোনাতেলা ভারসাচি"- এর ডিজাইন করা সবুজ রঙের একটি ড্রেস পরে পুরো ফ্যাশন জগতকে চমকে দেন "জেনিফার লোপেজ"। পরবর্তীতে এই ড্রেসটির নামকরন করা হয় "দ্য জাঙ্গল ড্রেস" নামে। আবারো ফ্যাশন জগতে শক্তিশালী হয়ে ফেরত আসে "ভারসাচি"। সারা পৃথিবীজুড়ে প্রায় ১৫০০ ফ্যাশন বুটিক রয়েছে "ভারসাচি"- এর। যদিও ব্যবসায়িক দিকে থেকে "ভারসাচি" এর অবস্থা ছিলো খুবই নাজুক। প্রায় সারাটা সময় জুড়েই অর্থনৈতিক টানাপোড়নে চলতে হয় তাদের। অবশেষে ২০১৮ সালে প্রায় ২ বিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে "ভারসাচি"- কে কিনে নেয় "মাইকেল করস"।


যদিও বিশ্ববাজারে "ভারসাচি"-এর আবেদন এখনো আগের মতোই রয়েছে। তর্ক- বিতর্ক, প্রতিবন্ধকতার মাঝ দিয়েই চলেছে "ভারসাচি"-এর পথচলা। তেমনিভাবে ২০১৯ সালে আবারো বেশ বিতর্কের জন্ম দেয় "ভারসাচি"। তাদের বাজারে নতুন প্রচলিত টপস- এর ডিজাইন দেখে এমন ধারণা হয় যে হংকং ও ম্যাকাও আলাদা দুটো দেশ যা চীনাবাজারে "ভারসাচি"-এর ভাবমূর্তি নষ্ট করে। এমনকি ব্র‍্যান্ডটির চাইনিজ ব্র‍্যান্ড অ্যাম্বাস্যাডর "ইয়াং মি" তাদের সাথে চুক্তি ভঙ্গ করে। পরবর্তীতে "ভারসাচি" বিশ্ববাজার থেকে তাদের বিতর্কিত কালেকশানটি তুলে নেয়। কখনো ভালোভাবে আবার কখনো খারাপ ভাবেই এগিয়ে চলেছে "ভারসাচি"-এর পথচলা। হাজার বিতর্ক হাজার মতামতের পরও ফ্যাশনপ্রেমীদের মনে এখনো শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে "ভারসাচি" ঠিক যেন গ্রীক পুরাণের মেডুসার মতো। তাহলে আক্ষরিক অর্থে বলাই যায় "জিয়ান্নি ভারসাচি"-এর অপূর্ণ স্বপ্ন কিছুটা হলেও পূরণ হয়েছে।



Mazadul Hasan Shishir

Mazedul Hasan ( Shishir ) lives in New York , United Stares of America and have been working in Textile sector since 2010. I have a experience both Knit and woven dyeing . Beside my job i have been writing also in several online Textile pages about Facebook Textile pages, Slides at Slideshare and Textile Factory Attachment . I have a great passion on it. I have so much eagerness on writing from my student life. without job time, i have spent my rest of the time on Blogging.If you have any question about me then you can pass it up to me at#Email: Mazadulhasan@yahoo.com.

1 মন্তব্যসমূহ

Please Select Embedded Mode To Show The Comment System.*

নবীনতর পূর্বতন