নবীন বস্ত্র প্রকৌশলীদের উদ্যেশ্যে কিছু কথা

আমার লিখা পুরাতন একটি স্ট্যাটাস, আবারও শেয়ার করলাম। কারন এখনও দৃশ্যপট আগের মতোই......

সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সদ্য পাশ করা টেক্সটাইল ইন্জিনিয়ারগন বেশ দিশাহীন হয়ে আছেন। গবেষক হিসেবে কাজ করেছি আমি স্বয়ং, আর আমার সহায়তা করেছে বেশ কিছু ছোট ভাইবোনদের ফোনকল ও নানা প্রশ্ন।

আমি নিজে যখন টেক্সটাইল ইন্জিনিয়ারিং বিষয়টির ছাত্র ছিলাম, তখন পাক্কা ৪ বছর পার হয়ে গিয়েছিলো শুধুমাত্র এটা পরিষ্কারভাবে বুঝতেই যে টেক্সটাইল ইন্জিনিয়ারদের কাজটা কি!! দুনিয়ার বই পুস্তক, মেশিন পাতি, ল্যাব-ট্যাব, ফ্যাক্টরী ভিজিট করে হুলুস্থুল অবস্থা। দিন শেষে মাথায় প্রশ্ন একটাই, এগুলোতো ওয়ার্কার, মেশিন অপারেটর, সুপারভাইজার বা ল্যাব টেকনিশিয়ানরাই দিব্যি করছেন। এখানে আমাদের মতো শুধুমাত্র টেক্সটাইল বিষয়ে পড়ুয়া পান্ডিত্যের বিশেষ ভূমিকা কি হতে পারে!! দুঃখজনক হলেও সত্যি এটাই ছিলো, এই মননশীল প্রশ্নের মানবিক উত্তর আমি কখনোই আমার ছাত্রজীবনে খুঁজে পাইনি। দুঃখজনক হলেও আরও সত্যি এখনও বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রীদের, টেক্সটাইল রিলেটেড পুথিগত বিদ্যার হরলিকস তাদের অনভিজ্ঞতার মস্তিষ্কজাত দুধে গুলিয়ে জাস্ট গিলিয়ে দেয়া হচ্ছে।স্টুডেন্টদের মধ্যে এক দুইজন যারা টুকটাক প্র্যাকটিক্যাল ফিল্ডের ধারণা রাখছেন, তারাও স্ব-উদ্যেগেই রাখছেন।এরকমটা নিজের কানে শোনা ও নিজ চোখে দেখা।

শুধুমাত্র অল্প করে ধারনা দেই, যে কোথায় একজন টেক্সটাইল ইন্জিনিয়ার ফ্যাক্টরীর অন্য সাধারন কর্মচারী-কর্মকর্তাদের চাইতে আলাদা। ছোটবেলা থেকেই আমরা জানি, সময়ের মূল্য অনেক।টেক্সটাইল বা গার্মেন্টস জগতে এই কথাটার বাস্তবতা হাঁড়ে হাঁড়ে, না কম হয়ে গেলো, একেবারে মজ্জায় মজ্জায় টের পাওয়া যায়। এখানেই প্রাথমিক পর্যায়ে একজন প্রকৌশলীর মূল স্বার্থকতা।যেখানেই ঢুকবেন সেখানেই আপনি প্রায় ৭০ টার মতো পুস্তক ঘাটা লোক।ঢুকে শুধুমাত্র প্র্যাক্টিক্যাল আ্যপ্লিকেশন দেখবেন আর দ্রুততার সাথে শিখে নিয়ে তা কাজে লাগাবেন। যেমন: একজন সাধারন বিষয়ে পড়ুয়া ছাত্র, স্পিনিং মিলে ঢুকে যতদিনে তুলার প্রকারভেদ, স্পিনিং এর প্রসেস ফ্লো-চার্ট, সব মেশিনের নাম ও কাজ, সুতার কাউন্ট ও প্রকারভেদ, মেশিন সেট আপ সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ, মেশিন মেইনট্যানেন্স এর বিষয়াদিসমূহ ইত্যাদি শিখবে, ততদিনে একজন বস্ত্র প্রকৌশলী হয়তো ফ্লোরের সব দায়িত্ব বুঝে নিয়ে শিফটিং ডিউটি পর্যালোচনা করা শুরু করে দিবে। কারন ঐ সব প্রশ্নের উত্তরগুলো,বস্ত্র প্রকৌশলী বহু আগে থেকেই তার শিক্ষা জীবনে জেনে এসেছেন।

তবে অভিজ্ঞতার দাম সবসময়ই দিতে হয়। আগেতো আর বাংলাদেশে টেক্সটাইল ইন্জিনিয়ারিং বিষয় ছিলোনা। আর থাকলেও আসন সংখ্যা সীমিত থাকায় এক বছরে ২০০ জনের বেশি পড়তে পারতেন না। তাই অনেক মানুষ অন্যান্য ভালো ভালো বিষয়ে নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা করে, এই টেক্সটাইল-গার্মেন্টস সেক্টরের হাল ধরেছেন।তারা সময়ের সাথে সাথে অভিজ্ঞতার আলোকে নিজেদের এই জগতের একজন জ্ঞানীগুনি মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। এমনকি তাদের মাঝেও অনেকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে টেক্সটাইল ইন্জিনিয়ারিং পড়ুয়া ছাত্রদের ক্লাস নিচ্ছেন। বিষয়টি বেশ ইতিবাচকই বলবো যে সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি।

তবে চাওয়া বলতে একটাই, ছাত্র-ছাত্রীদের বেশি করে বাস্তব জগতের কাছাকাছি নিয়ে আসুন। বই পুস্তক পড়ে তারা যতটুকু জানার সেটিতো জানবেই, কিন্তু প্র্যাক্টিক্যালি কি হয় না হয় এগুলো না জানালে তাদের অসম্পূর্ণ শিক্ষা দেয়া হবে। এখনতো ইন্টারনেটের ব্যবহার সর্বস্তরে, ক্লাসরুমে চাইলেই সবকিছু চোখের সামনে দেখানো যায়। কানের রাস্তা দিয়ে মস্তিষ্কে পৌছানো আর চোখ দিয়ে পৌছানোর মধ্যে পার্থক্য আছে। কারণ এক কান দিয়ে ঢুকলে সোজাসুজি আরেক কান দিয়ে বের হয়ে যাবার রিস্ক থাকে, তবে চোখ দিয়ে ঢোকানো হলে মগজে গাঁথবেই। আরও যে বিষয়টি করা উচিৎ বলে মনে করি তা হলো বেশি করে চাকরী জীবনের ঘাত প্রতিঘাতের বিষয়গুলো সম্পর্কে ছাত্র-ছাত্রীদের জানানো।শিফটিং ডিউটির খুঁটিনাটি, বাসা টু ফ্যাক্টরী যাওয়া আসার ব্যাপারগুলো, ফ্লোরের কর্ম পরিবেশ, সিনিয়রদের মান্য করা,  আর মান্য করতে গিয়ে পরিস্থিতি সাপেক্ষে বহুধরনের ভালোমন্দ গালমন্দ হজম করা, জব পলিটিক্সের বিষয়াদি, ছুটিছাটা বিসর্জন দেয়ার মানসিকতা রাখা, প্রথম কয়েকটা বছর শারীরিক আর মানসিক কষ্ট মোকাবিলা করার মতো করে  গড়ে তোলা ইত্যাদি খুব বাস্তব বিষয়গুলো সম্পর্কে সবাইকে আগে থেকেই অবহিত করতে হবে। হোক সেটা প্রতিটি ক্লাসের শেষ পনেরো মিনিট, সপ্তাহে অন্তত একদিন হলেও চলবে।ছোট শিক্ষকতার জীবনটায় আমি এটা রেগুলার করতাম, আর স্টুডেন্টরাও বেশ ভালোভাবে কানেক্ট করতো।

আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেনো জেনেশুনে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে প্রবেশ করে যার যার কর্মস্থলে। চোখে স্বপ্নের এক জগত সাজিয়ে ফ্যাক্টরী বা বিভিন্ন বায়িং অফিসে ঢুকে অতঃপর যেনো বাস্তবতার সম্মুখীন হতে না হয়। তারা যেনো সব ধরনের প্রতিকূল পরিবেশ মুখোমুখি হবার পূর্ব প্রস্তুতি নিয়েই পাশ করে বের হয়।তা না হলে প্রতি ছয় মাস অন্তর অন্তর চাকরি খোঁজার এই রেস বন্ধ হবার নয়। কি হয়েছে প্রশ্ন করলে উত্তর ঐ কয়েকটাই, হয় বস ভালো না, নয়তো কলিগগুলোর সাথে বনিবনা নাই, তা না হলে কাজের ধরাবাধা কোনো সময় নাই ইত্যাদি ইত্যাদি।

ফোনে ছোটখাটো লেকচার শেষে আমি ভাবি, চার বছর ধরে প্রকৌশলী হবার তরে সবই শিখলো, শুধুমাত্র টাইটেলটা ধারণ করে টিকে থাকার উপায়টুকুই শিখলো না।কি লাভ হলো এতকিছু শিখে!! এ যেনো অনেকটাই, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করাটাই কঠিন- এর মতো হয়ে গেলো। দিন পরিবর্তনের পালা শুরু হোক আজ থেকেই, প্রত্যাশা রইলো এটুকুই।


লিখেছেনঃ সিরাজুম মনির  
Mazadul Hasan Shishir

Mazedul Hasan ( Shishir ) lives in New York , United Stares of America and have been working in Textile sector since 2010. I have a experience both Knit and woven dyeing . Beside my job i have been writing also in several online Textile pages about Facebook Textile pages, Slides at Slideshare and Textile Factory Attachment . I have a great passion on it. I have so much eagerness on writing from my student life. without job time, i have spent my rest of the time on Blogging.If you have any question about me then you can pass it up to me at#Email: Mazadulhasan@yahoo.com.

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Please Select Embedded Mode To Show The Comment System.*

নবীনতর পূর্বতন