এনভয় গ্রুপের শুরুর গল্প | Envoy Group | Envoy Textile Ltd

ব্যবসা করতে মূলধন নয় চাই স্বপ্ন ও সাহস – ইঞ্জি. কুতুব উদ্দিন আহমেদ (চেয়ারম্যান, এনভয় গ্রুপ)



জীবনে সব সময় দুটি জিনিস মেনে চলেছি। বড় হতে হলে স্বপ্ন দেখতে-জানতে হয়। অবশ্য সব স্বপ্নই বাস্তবায়িত হবে এমন নয়। যদি এর ৬০ বা ৭০ শতাংশ বাস্তবায়িত হয় তাহলেই মানুষের জীবন বদলে যায়। দ্বিতীয় হল ব্যবসা করতে মূলধন লাগে না— স্বপ্ন ও সাহস লাগে। আমিই এর বড় প্রমাণ। যখন ব্যবসা শুরু করি তখন সাহস, সততা আর পরিশ্রম করার মানসিকতা ছাড়া আর কোন মূলধন ছিল না আমার। আজ প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হতে পেরেছি কেবল স্বপ্ন দেখার অভ্যাসের কারণে।

আমার শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের গল্প আর দশজনের মতোই সাধারণ। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, ফলে ছোট থেকেই স্বপ্ন ছিল নিজে কিছু করব, বড়লোক হব। শেলটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. তৌফিক আমার কাছের বন্ধু। স্কুল, কলেজ এবং বুয়েটে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছি। দু’জনের বন্ধুত্ব ৪৫ বছরের বেশি। বুয়েটে পড়াকালীন দুই বন্ধু মিলে রাতে আড্ডা দিতাম। সে সময়ও দু’জনের চিন্তা ছিলো কিভাবে বড়লোক হওয়া যায়। দুজনেই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। ৫ বোনের একমাত্র ভাই আমি। বাবার সরকারি চাকরি। সব ভাইবোনের পড়াশোনার খরচ জোগানো তার পক্ষে কষ্টকর হয়ে যেত। ফলে টাকা পয়সা নিয়ে টানাপোড়েন লেগেই থাকত সংসারে।

এমন পরিবারের ছেলেদের বড়লোক বা বিত্তবান হবার স্বপ্ন সব সময় থাকে। আমার বোধহয় তা একটু বেশিই ছিল। বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বেরোলাম। পাশ করার পর সরকারি চাকরিতে এসিট্যান্ট ইঞ্চিনিয়ারের বেতন ছিলো ১১‘শ ৫০ টাকা। সে সময় ভাবতাম, মাসে ১০ হাজার টাকা আয় করতে পারলেও আর কিছু চিন্তা করবো না; আরামের জীবনটা কাটাব।
ঢাকাতে পৈত্রিক বাড়ি ছিলো আমাদের দুই বন্ধুরই। একে সৌভাগ্য বলতে পারেন। সেটি আহামরি কিছু না, কিন্তু মাথাগোজার জন্য অন্যের দারস্থ হতে হয়নি কখনো। মগবাজারে সে বাড়িটা এখনো আছে। তবে ওখানে চ্যারিটি হাসপাতাল চালাই এখন।
বুয়েট থেকে বের হওয়ার পর চাকরি নিলাম, বিয়ে করলাম। যখন বিয়ে করি তখন জনতা ব্যাংকের ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরি করতাম। অবশ্য পাশ করার এক বছরের মধ্যেই সরকারি চাকরিতে ঢুকেছিলাম ৭টি ইনক্রিমেন্ট নিয়ে। বিয়ের আগেই আমার বাবা মারা যান। বড় ৫ বোনের কাছে কৃতজ্ঞ। তারা বউয়ের গয়নার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। আমি কেবল এনগেজমেন্ট রিংটি কিনেছিলাম। বউভাত করতে গিয়ে আটকে গেলাম। বউভাত করার পয়সা নাই। টাকা জোগাড় করতে পারি না। আবার বউভাত তো করতেই হবে। আমার এক বোনের স্বামী ডাক্তার। তারা সে সময় ইরানে। দেশে কিছু কিছু টাকা পাঠাতেন। ওই টাকার নমিনি আমি। বহু কষ্টে ইরানে বোনের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তার স্বামীর কাছ থেকে ৮০ হাজার টাকা ধার নিলাম বৌভাত করার জন্য। বললাম ধীরে ধীরে শোধ দেবো।

চাকরি পাওয়ার ঘটনাও মজার। ইন্টারভিউ দিয়ে এসে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। হঠাত্ একদিন আমার ঠিকানায় ৭টি ইনক্রিমেন্ট সহ নিয়োগ পত্র এসে হাজির। বাবা জানতে চাইলেন ব্যাংকে জয়েন করবো কিনা? বাবাকে জানালাম, করব; কারণ ব্যবসা করতে চাই। ব্যাংকের চাকরির সুবাদে ব্যাংকারদের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ঘটবে অন্তত। বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পে এ কাজটা খুব খারাপ হবে না। তাছাড়া ভালো না লাগলে ছেড়ে দিব। বাবার সম্মতিতে ১৯৮০ সালের এপ্রিলে জনতা ব্যাংকে যোগ দেই।






কাজ শুরুর পর ভালই লাগছিলো। নতুন নতুন মেশিন চিনছি। ব্যাংকারদের সাথে পরিচয় হচ্ছে । ব্যাংকের আইনকানুন জানছি-শিখছি। কাজ করতে গিয়ে দেখলাম অন্যরা যা জানে তার থেকে খুব কম জানি না। বুয়েটে হিসাববিজ্ঞানের একটা কোর্স ছিল। কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না। পরে অবশ্য এর উপর ভিত্তি করেই বিআইবিএম থেকে একটা কোর্সও সম্পন্ন করেছিলাম।
সব মিলিয়ে ভালই কাটছিলো। চাকরির কারণে সারাদেশে ট্যুর করতে হতো। বেতন আর ট্যুর অ্যালাউন্স মিলিয়ে মাসে সৎভাবেই প্রায় ৫ হাজার টাকা রোজগার হত। ঘুষ নেয়ার সুযোগ ছিল, কিন্তু কোনদিন নেইনি। আজকের অনেক বড় ব্যবসায়ীদের সে সময় প্রজেক্ট দিয়েছি আমি। দারুণ সময় পার করছি তখন। নানা ব্যবসার প্রজেক্ট দিচ্ছি। একবার অফিসের বসের এক আত্নীয়ের জন্য চাকরির তদবির নিয়ে গেলাম জনতা ব্যাংকের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে। কথা প্রসঙ্গে উনি বললেন, মানুষকে আর কতো প্রজেক্ট দিবেন। তার চেয়ে বরং নিজে একটা প্রজেক্ট করেন। তাকে আমি মজা করে বললাম ‘রাজমিস্ত্রি বাড়ি বানায়, বাড়িতে থাকে না।’

আমি প্রজেক্ট দিই মানুষকে। নতুন নতুন ব্যবসার প্রকল্প নিয়ে যারা আসে ওই প্রকল্পে তাদের অর্থায়নের ব্যবস্থা করি। অথচ নিজে প্রজেক্ট করার মতো একটি টাকাও আমার নেই। নির্বাহী প্রকৌশলী সাহেবকে এটা জানালাম। বউভাত বাবদ ৮০ হাজার টাকার ঋণ শোধ করতে পারছি না, তাও বললাম। ভদ্রলোক জানতে চাইলেন প্রজেক্ট করতে কতো টাকা লাগে। তাকে জানালাম ব্যাংক ঋণ পেতে হলে ৩০ শতাংশ ইক্যুয়িটি নিজের থাকতে হয়। নির্বাহী প্রকৌশলী সাহেব আমাকে ৩ লাখ টাকা দিতে চাইলেন আর বাকী ৭ লাখ ব্যাংক থেকে নিতে বললেন। অর্থাত্ ১০ লাখে ব্যবসা শুরুর প্রস্তাব দিলেন তিনি। চোখে তখন বিরাট স্বপ্ন আমার। তাকে জানালাম, ৩০ লাখের কমে প্রজেক্ট হবে না। জানতে চাইলেন, কি করতে চাই। আমি বললাম সবাই গার্মেন্টস করছে, এটি করা যেতে পারে। তার মানে— ব্যাংক ঋণ পেতে হলে ইক্যুয়িটি লাগবে ১০ লাখ টাকা! ইক্যুয়িটির নগদ ৫ লাখ টাকা দিতে রাজি হলেন তিনি। বাকী ৫ লাখ টাকার জন্য আরেকজন পার্টনার যোগাড় করার পরামর্শ দিলেন। তখন নিজের ঝুঁকির কথা বলালাম। তাকে বললাম, চাকরি ছেড়ে প্রজেক্ট শুরু করছি কিছুদিনপর আপনি যদি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন, তাহলে কি হবে? আমার ব্যাংক একাউন্টে ৫ লাখ টাকা অগ্রিম জমা দেন। তাহলে বুঝবো আপনি সিরিয়াস। পাশাপাশি সংসার চালানোর জন্য মাসে মাসে ৫ হাজার টাকা করে দিতে হবে। শর্ত মেনে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে বললেন তিনি। ন্যাশনাল ব্যাংকে গিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে ফেললাম। পরের দিনই আমার অ্যাকাউন্টে ৩ লাখ টাকা জমা দিলেন তিনি। এর পর আরো কিছু টাকা দেন। সব মিলিয়ে লাখ চারেক মতো।
মনে মনে একজন পার্টনারের খোঁজ করছি। আমি তখন মোহামেডান স্পোটিং ক্লাবের একজন অফিসিয়াল। বাফুফের বর্তমান সহসভাপতি বাদল রায় তখন দলটির খেলোয়োড়। ব্যবসা করলে সাথে নেয়ার কথা সে বলেছিল আমাকে। বাদলের সাথে কথা বলতে মোহামেডান অফিসে গেলাম। পথে সালাম মুর্শেদীর সাথে দেখা। সে জানতে চাইলো, কোথায় যাচ্ছি। বললাম, বাদলের সাথে দেখা করতে। ও জানাল সে তো নেই। আমি ফেরত যেতে রওয়ানা হচ্ছি। তখন জানতে চাইলো বিষয়টি, তাকে বলা যাবে কিনা। আমি বললাম, তেমন কিছু না। বাদল ব্যবসায় বিনিয়োগের কথা বলেছিল, তাই আলাপ করতে এলাম। সালাম মুর্শেদী বলল,‘আমাকে নিয়ে নেন’। বললাম তাহলে নির্বাহী প্রকৌশলী সাহেবের কাছে যেতে হবে মোতাকে। কারণ, তিনিই প্রথম উদ্যোক্তা। সালামকে নিয়ে তার কাছে তিনি এলাম। আলাপ-আলোচনার পর রাজি হলেন নিয়ে। ব্যাংকে টাকা জমা দিতে বললেন। সালামের একটা এফডিআর ছিল ৪ লাখ টাকার মতো। এফডিআর ভেঙ্গে আমার একাউন্টে জমা করে দেয় সে। প্রজেক্ট করব জানিয়ে ব্যাংকের চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়ে নেই। তখনকার ডিজিএম মোশারফ হোসেন (মিউটুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক এমডি) প্রমোশন দেয়ার কথা বললেন, বেতন বাড়ানোর কথা বললেন। কিন্তু আমার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে বললাম, এখন আর সম্ভব না। পার্টনাররা আমাকে টাকা দিয়ে দিয়েছে। এখান থেকে ফিরে আসা সম্ভব না। যা হয় দেখি।


পার্টনাররা তাদের কথা অনুযায়ী ১০ লাখ টাকা দিলেন আমাকে। ব্যাংকে গেলাম ঋণপত্র (এলসি) খোলার জন্য। বাড়ি বন্ধক রাখার কথা বলল তারা। আমাদের বাড়িটা বন্ধক রেখে ঋণ নিলাম, এলসি খুললাম। তারপর শুরু করলাম অনেক আকাঙ্খার প্রজেক্ট। বায়ার কারা জানি না, কোথা থেকে অর্ডার পাবো জানি না। কিভাবে গার্মেন্টস চালায় তাও জানি না। কোন অভিজ্ঞতাই নাই। শুধু নিজের ওপরে সাহস ছিল। সাহসের উপর ভর করে প্রথমে একটা সাব— কন্ট্রাক্ট নিলাম। কাজটা শেষ হওয়ার পর মুম্বাই থেকে এক ভদ্রলোক এলেন আমার সাথে কথা বলতে। বিদেশী দেখে আমার ভাড়া করা এসিটা ছেড়ে দিলাম তাকে। এসির শব্দে তিনি বললেন, বুঝতে পেরেছি তোমার ঘরে এসি আছে। এখন এটা বন্ধ করে দাও, বেশ শব্দ করছে। বললাম, আমি এসি ছাড়াই অভ্যস্ত, তোমাদের মতো বিদেশিদের জন্য রেখেছি। বাকি সময় বন্ধই থাকে এটি। আমার সহজ সরল কথায় মুগ্ধ হলো সে। ফ্যাক্টরি ভিজিট করতে চাইলে আমি তাকে নিয়ে যাই। সেটি আয়তনে ছোট ছিল তবে উত্পাদন দক্ষতা ছিল অন্যদের থেকে বেশী। সে প্রথম ট্রায়াল হিসেবে ৬ হাজার পিস ম্যাংগো পায়জামার অর্ডার দেয়। ব্যবসায় নতুন হিসেবে ১০ দিনের মধ্যে সরবরাহ করার সুযোগ দেয়া হলো আমাকে। অনভিজ্ঞতার জন্য আনুসাঙ্গিক কাজ শেষ করতে ৫ দিন পার হয়ে যায়। তারপর রাতদিন ২৪ ঘন্টা কাজ করে সে অর্ডার যথাসময়ে শিপমেন্ট করি।

ব্যাংক থেকে বিল পাওয়ার পরভারতীয় ভদ্রলোক আকবার লাখখানীর টাকা পরিশোধ করতে হোটেলে গেলাম। কাজ দেয়ার সময়ই কমিশন নেয়ার কথা বলেছিলেন তিনি। আমাকে দেখে বিরক্তই হলেন তিনি। পরে টাকা নিয়ে আসার কথা শুনে খুব অবাক হলেন। নিজ থেকে কমিশনের টাকা পরিশোধ করতে কেউ তার কাছে আসেনি এর আগে। খুশী হয়ে আমাকে ছেলে হিসেবে স্বীকৃতি দেন ভদ্রলোক। আমি তার আস্থা অর্জন করতে পেরেছিলাম। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। মাত্র ১১ মাসের মাথায় আমি পার্টনার এবং ব্যাংকের সব ঋণ শোধ করে দেই।
ভদ্রলোক আমাকে এত অর্ডার দিতে থাকেন যে, ১৪ টা ফ্যাক্টরিতে আমার সাব কন্ট্রাক্ট চলে তখন। তাকে বলেছিলাম এসব তদারকি করার মতো লোক নেই। সে নিজেই বেশীরভাগ ফ্যাক্টরি সে নিজেই মনিটর করত। আমাকে ধনী বানাতে চায় বলেই সেসব অর্ডার আমাকে দিয়েছিলেন তিনি। ৮৪ সালে ব্যবসা শুরুর পর ৮৬-তে এসেই আমার ব্যাংকে জমা হয় ১ কোটি টাকা। নগদ টাকা দিয়ে গামের্ন্টস কেনা শুরু করি তখন। যাদুর মতো কাজ করছিল সব কিছু। এর মধ্যে দুই নম্বর কাজ করার জন্যও অনেকে বলেছে। কিন্তু কোনদিন সেসব দিকে যাইনি। জীবনে হারাম কিছু করব না, এটা সবসময় ধর্মের মতো করে পালন করে আসছি।


জীবনে তিনবার নির্বাচন করেছি, তিনবারই জিতেছি। বিজিএমইএ’র প্রেসিডেন্ট হিসেবে এক সময় প্রায় প্রতিদিনই সংবাদে এসেছি। দেশে খেলাধুলার ইতিহাসের বড় ইভেন্ট সাউথ এশিয়ান গেমস আমার হাত ধরে হয়েছে। সে বছর সব থেকে বেশী পুরস্কার অর্জনের কৃতিত্বও অর্জন করে বাংলাদেশ। ক্রীড়াক্ষেত্রে অবদানের জন্য সরকারের কাছ থেকে জাতীয় ক্রীড়া পুরষ্কার অর্জন করেছি। এখন আর এসব করে আনন্দ পাই না। পরিবারের সঙ্গে সময় দেয়াতেই বেশী আনন্দ পাই। ব্যবসা করতে গিয়ে দীর্ঘসময় ব্যয় করেছি, পরিবারকে সময় দিতে পারিনি। আমার স্ত্রী একদিন বলল, আমি যখন ব্যাংকে কাজ করতাম সেসময় তাকে নিয়ে রিকশায় চড়ে ঘুরতাম, বাদাম কিনে খেতাম। ওই সময়টাই তার জন্য আনন্দের ছিল। এখন আমাদের গাড়ী-বাড়ি হয়েছে কিন্তু সেসময়ের সুখ আর সে পায় না। এ কথাটা আমাকে খুব নাড়া দেয়। এ কারণে আমি আর কোথাও সেভাবে যাই না। তাকে সময় দেওয়ার জন্য প্রায় কোন অনুষ্ঠানেই যাই না। ব্যবসার বাইরে পুরো সময় এখন পরিবারকেই দিচ্ছি।

বেসরকারি খাতে আমার ব্যবসা অনেক দিকে বিস্তৃত। আকারে অনেক বড় না হতে পারে তবে নানা প্রকারের ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছি। গার্মেন্টস দিয়ে শুরু করলেও পরে আইটি ফার্ম, টেক্সটাইল ফার্ম, ট্রেড ফরওয়ার্ডিং, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, রিয়েল এস্টেট, ট্রেডিং, কার্গো, বেঙ্গল মিটসহ বহুমূখী খাতে আমার বিনিয়োগ রয়েছে। গত বছর প্রথমবারের মতো আবেদন করেই টেক্সটাইলে রফতানি ট্রফি (স্বর্ণপদক) পেয়েছি। গার্মেন্টেসে দ্বিতীয় সেরার মর্যাদা পেয়েছি। এরপরও নতুন ব্যবস্য শুরু করতে একধরনের আনন্দ হয়। নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে ভালো লাগে। লোকসানি ব্যবসা সফল করতে আরো বেশী জেদ চাপে। যে ব্যবসাই করি না কেন, সুনামের সাথে করেছি। নৈতিকতা ধরে রেখেই করেছি।


গত ছয় মাসে ব্যবসায়িক কাজে পাঁচ বার চীন। এ মন্দার মধ্যেও যেসব ইন্ড্রাস্ট্রিতে গিয়েছি সেখানে দেখি ২৪ ঘন্টা কাজ হচ্ছে। এসব পণ্য নিজেদের ব্যবহারের জন্য বানাচ্ছে তারা। চীনের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ইউরোপ— আমেরিকার পুরো বাজারের চেয়ে বেশী। ১২০ কোটি জনসংখ্যার দেশে নিজেদের চাহিদা মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে। তাদের বাজারে ডেনিমের বেশ চাহিদা আছে। একারণে চীনে আমাদের গার্মেন্টস পণ্যের বড় বাজার আছে। চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এখন গার্মেন্টস ব্যবসা তার তাদের জন্য লাভজনক নয়। এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি গার্মেন্টস দিয়ে শুরু হলেও পরবর্তীতে তারাও এটিকে লাভজনক হিসেবে ধরে রাখতে পারেনি। যেমন কোরিয়া, জাপান, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড। এসব দেশের রফতানি বাণিজ্য গার্মেন্টস ব্যবসা দিয়ে হলেও পরে তারা ব্যবসা অন্য খাতে প্রবাহিত করেছে। তবে তাদের স্থানীয় বাজারে গার্মেন্টস পণ্যর চাহিদা আছে। এ বাজার আগামীতে বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, মিয়ানমারের গার্মেন্টস পণ্য নিয়ন্ত্রণ করবে। এরা কেউ বাংলাদেশের জন্য হুমকি হতে পারবে না। নিজস্ব তুলা, সুতা থাকার পরও ভারত আমাদের গার্মেন্টস ব্যবসার জন্য হুমকি হতে পারেনি।

গার্মেন্টস পণ্যর চাহিদা অনেকটা পিরামিডের মতো। যত নিচে ততো বেশী পরিমান পোশাকের চাহিদা তৈরী হয়। কারণে বাংলাদেশের গার্মেন্টস ফ্লারিশ করছে। আমি মনে করি বাংলাদেশের পরিচিতি গার্মেন্টস এবং টেক্সটাইল দিয়েই হবে। নিজেদের তুলার তেমন উত্পাদন নেই আমাদের। তবে আমাদের শ্রমিকদের দক্ষতার কারণে এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি আমরা। এখানকার শ্রমিকরা নিয়ম মেনে সময়মতো কাজ করে চলেছে, এজন্য তারা ধন্যবাদ পাবেন। আমাদের শ্রমিকরা কাজের প্রতি নিবেদিত, বিশেষ করে নারীরা। দারিদ্র্য আছে বলেই তারা ঘন্টার পর ঘন্টা এক জায়গায় বসে কাজ করে। সব গার্মেন্টসে কাজের পরিবেশ এক রকম না। তারপরও আমাদের শ্রমিকরা শ্রম দিতে কার্পণ্য করেন না।






মজার ঘটনা বলি। রাশিয়ার এক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি বিপণনের দায়িত্ব নেয়ার শর্তে আমাকে ৫০ শতাংশ শেয়ার দিতে চেয়েছিল। আমি লাভজনক বিবেচনা করে ওদের কারখানা দেখতে গেলাম। গিয়ে দেখলাম, ৫টা বাজলেই সবাই কাজ ছেড়ে উঠে পড়ে। ওভারটাইম করতে রাজি হয় না কেউ। এতে ঠিকসময়ে তারা শিপমেন্ট দিতে পারে না। তাদের শ্রমিকদের এ মানসিকতা দেখে বললাম, তোমাদের জন্যই গার্মেন্টস ব্যবসা লাভজনক হবে না। একই অবস্থা ভারতের ক্ষেত্রেও। ট্রেড ইউনিয়েন গঠনের ভয়ে এক কারখানায় ৫০ জনের কম শ্রমিক নিয়োগ দেয় তারা। এতে একটি ফ্যাক্টরির কয়েকটি আলাদা ইউনিট করতে হয়। কাজ ভাগ করে নানা জায়গা থেকে করাতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ। এজন্য ভারতের সব থাকা সত্ত্বেও তারা গার্মেন্টসে ভাল করতে পারছে না। অন্যদিকে এ খাতে পেশাদারিত্ব দাঁড়িয়ে গেছে আমাদের। পোশাক শিল্পের ইতিহাসে যে সাফল্যর গল্প, তা আমাদের শ্রমিকদের কৃতিত্ব। উদ্যেক্তাদেরও কৃতিত্ব আছে কিন্তু এসব শ্রমিক যদি পেশাদারিত্ব নিয়ে কাজ না করতেন, তা হলে এসব সাফল্য জমত না।
দেশের বেসরকারিখাত বিস্তৃত হচ্ছে। নতুন প্রজন্ম দায়িত্ব নিচ্ছে। দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যবসায়ীদের বেশীর ভাগই পরিবার নিয়ন্ত্রিত। প্রথম এবং দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি পার্থক্য আছে। প্রথম প্রজন্মের সব ব্যবসায়ী সন্দেহতীতভাবে উদ্যোক্তা শ্রেণীর। কিন্তু দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যবসায়ীদের বেশীর ভাগই ব্যবসায়ী। অবশ্য তাদের একটা প্লাস পয়েন্ট আছে। ব্যবসায় নামার জন্য তারা প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। তাদের এ বিষয়ে শিক্ষা আছে। তারা তাদের বাবাকে ব্যবসা করতে দেখে, সে পরিবেশের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে । প্রথম প্রজন্মের ব্যবসায়ীরা এ সুযোগ পায় নি। দ্বিতীয় প্রজন্ম চাইলে উদ্যোক্তাও হতে পারবে। তাদের জন্য সে সুযোগ অবশ্যই আছে। তবে সবাই যে ভাল করছে এমনটাও না। অনেকে ঠিক ভাবে করতে পারছে না বলে দ্বিতীয় প্রজন্মে এসে ব্যবসা বিক্রি করে দিচ্ছে। আবার অনেকে খুবই ভাল করছে।
আমার ছেলে যখন ব্যবসায় নামে আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুই ব্যবসায়ী হবি না উদ্যোক্তা হবি। সে নতুন চালেঞ্জ নিতে চায় বলে আমাকে জানায়। তাকে প্লাটিনাম সুইটস লাভজনক করার দায়িত্ব দিলাম। এ ধরনের ব্যবসা করার অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। সে এই চ্যালেঞ্জ নিয়ে সফল হয়েছে। প্লাটিনাম সুইটস এখন লাভজনক ব্যবসা। পাশাপাশি রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা দেখছে। বেশ ভালই করছে সে।


সবমিলে বেসরকারি খাতের ভবিষ্যত্ নিয়ে আমি ভীষন আশাবাদী। বাংলাদেশ একমাত্র দেশ, যেখানে নতুন ধরনের ব্যবসা করার সুযোগ আছে। একথা বিদেশীরাও বলেন। এসব খাতে ব্যবসা করে পয়সা কামানো সবচেয়ে সহজ। পাশাপাশি বেশ কিছু বাধা আছে। তবে যেসব বিদেশীরা এখানে ব্যবসা শুরু করেছেন, তারা এটাকে লাভজনক বলেই মনে করছেন। লাভজনক না হলে অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতেন। সার্ভিস সেক্টরে অনেক কিছু করার সুযোগ আছে। প্রতিযোগিতা বাড়লেও অনেক না ছোঁয়া ব্যবসা এখনো আছে দেশে। পর্যটন খাতের পুরোটাই খালি। ভাল চেইন ডিপার্টমেন্টাল স্টোর নাই। ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায় বড় সুযোগ আছে। নতুন উদ্যোক্তারা এসব সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। এখান থেকে অনেকে উদ্যোক্তা হিসেবে বেরিয়ে আসতে পারে। প্রতিবন্ধকতা সব সময়ই থাকবে। কিন্তু সাহস নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। লেগে থাকার প্রবণতা থাকলে উদ্যোক্তা হিসেবে সফল হওয়া সম্ভব। নতুন নতুন আইডয়া নিয়ে ব্যবসা শুরু করতে হবে। ব্যবসার অনেক সুযোগ আছে। সেসব কাজে লাগাতে হবে। ইচ্ছা থাকলে ছোট দিয়ে শুরু করে বড় হওয়া যায়। চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগিয়ে যেতে পারলে বড় হওয়া কোন বিষয় নয়।

Mazadul Hasan Shishir

Mazedul Hasan ( Shishir ) lives in New York , United Stares of America and have been working in Textile sector since 2010. I have a experience both Knit and woven dyeing . Beside my job i have been writing also in several online Textile pages about Facebook Textile pages, Slides at Slideshare and Textile Factory Attachment . I have a great passion on it. I have so much eagerness on writing from my student life. without job time, i have spent my rest of the time on Blogging.If you have any question about me then you can pass it up to me at#Email: Mazadulhasan@yahoo.com.

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Please Select Embedded Mode To Show The Comment System.*

নবীনতর পূর্বতন